থাইল্যান্ডের মায়া বে সমুদ্র সৈকতে অবস্থিত ম্যানগ্রোভ ও প্রবাল এখন হুমকীর মুখে শুধুমাত্র পর্যটকদের কারণে... থাইল্যান্ডের মায়া বে সমুদ্র সৈকতে অবস্থিত ম্যানগ্রোভ ও প্রবাল এখন হুমকীর মুখে শুধুমাত্র পর্যটকদের কারণে...

পৃথিবী নামক গ্রহে বসবাসকারী মানুষরূপী এলিয়েনদের ভিন গ্রহে পাঠানোর সময় হয়ে গেছে!

বর্তমানে পর্যটন আকর্ষণ এর ক্ষেত্রগুলোর জনপ্রিয়তা অনেকটাই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোর উপর নির্ভর করে। পর্যটকদের ৫৬% দাবি করেন, ইন্টারনেটে প্রদত্ত তথ্য এবং বিজ্ঞাপন মূলত তাদের ভ্রমণ পরিকল্পনা কে প্রভাবিত করে। কিন্তু এই ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা মোটেও পর্যটনের আকর্ষণীয় ক্ষেত্রগুলোর জন্য শুভকর নয়। এবং এটা শুধুমাত্র পর্যটকদের ফেলে দেয়া ময়লা আবর্জনা কিংবা দেয়ালে লেখা কোন চিত্র নয়, পর্যটকরা বিভিন্ন উপায়ে আন্তর্জাতিক পর্যটন ক্ষেত্রগুলোর মারাত্মক ক্ষতি সাধন করছে। আমরা আজ আপনাদের ১০ টি জনপ্রিয় পর্যটন স্থান দেখাবো যেগুলো মানুষের কারণে বিভিন্ন উপায়ে ভারসাম্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হারিয়েছে। 

১. থাইল্যান্ডের মায়া বে সমুদ্র সৈকত

Internet

Internet

লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর "দ্য বিচ" (২০০০) ছবিতে থাইল্যান্ডের মায়াবে সমুদ্র সৈকত দেখানোর পর থেকেই এর জনপ্রিয়তা প্রচুর পরিমাণে বেড়ে গিয়েছিল। অতিরিক্ত পর্যটক এর কারনে সমুদ্র সৈকতের প্রবাল প্রাচীর ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল মারাত্মকভাবে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। কিছুদিন আগে ২০১৮ সালের ১লা জুন সেখানকার কর্তৃপক্ষ সমুদ্র সৈকতটিকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছিল। যার কারণ ছিল সমুদ্র সৈকত টি কে পুনরুজ্জীবিত করার পাশাপাশি প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা। বন্যরা কখনোই প্রকৃতি ধ্বংস করে না কিংবা ভারসাম্য নষ্ট করে না। আমরা বুদ্ধিমান মানুষ গুলোই এই ভারসাম্য নষ্টের জন্য সবদিক থেকেই দায়ী।

২. ক্রিসমাস দ্বীপের সামুদ্রিক প্রবাল, অস্ট্রেলিয়া

© National Geographic

© National Geographic

মাত্র ১০ মাসের মধ্যে এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত ক্রিসমাস দ্বীপের প্রবাল গুলোর ৯০% এরও বেশি ধ্বংস হয়ে গেছে। কিছু প্রবাল ফ্যাকাশে হয়ে গেছে এবং অন্যগুলো মারা গেছে। এমনটা ঘটার পেছনে দায়ী হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট প্রবল তাপ।

৩. ব্রাজিল প্যারাগুয়ে সীমান্তে অবস্থিত গুয়াইরা জলপ্রপাত

© National Geographic

© National Geographic

এই অন্যতম সুন্দর স্থানটি একসময় জলপ্রপাতের ধারায় আচ্ছাদিত ছিল। ১৯৮২ সালে ইটিপুর জলবিদ্যুৎ বাঁধে সংরক্ষিত পানির ধারা প্লাবিত হয় এই ঝর্ণাধারা। পরবর্তীতে এখানকার পাথরগুলোকে ডায়নামাইট বিস্ফোরণের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়েছিল।

৪. স্পেনের আলতামিরা গুহা

© Yvon Fruneau / Wikimedia Commons   © Museo de Altamira y D. Rodríguez / Wikimedia Commons

© Yvon Fruneau / Wikimedia Commons © Museo de Altamira y D. Rodríguez / Wikimedia Commons

২০০২ সালে এটাকে দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। প্রচুর পরিমানের পর্যটকদের কারণে এখানকার প্রাগৈতিহাসিক চিত্রকর্মগুলো নষ্ট হয়ে গেছে যার কারণ ছিল পর্যটকদের শ্বাসপ্রশ্বাস থেকে নির্গত পানির বাষ্প এবং কার্বন ডাই অক্সাইড। এর ফলে চিত্রকর্মগুলোর বেশ কিছু অংশে ছাতা পড়েছে। ২০০১ সালে এই গুহাটির আদলে পাশাপাশি স্থানে আরেকটি নকল জাদুঘর তৈরি করা হয়েছে যেখানে পর্যটকরা এই ছবিগুলোর পুনঃনির্মিত ছবিগুলো উপভোগ করতে পারবেন।

৫. বলিভিয়ার সোকালটিয়া হিমবাহ

© Unknown / Wikimedia Commons   © Isabel Moreno Rivadeneira / Wikimedia Commons

© Unknown / Wikimedia Commons © Isabel Moreno Rivadeneira / Wikimedia Commons

বলিভিয়ার এই জায়গাটিতে ১৮,০০০ বছর আগে ধীরে ধীরে বরফ জমতে জমতে তুষারের পর্বত তৈরি হয়েছিল। এবং এটা ছিল দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে উচুতম গ্লেসিয়ার গুলোর একটি। ১৯৮০ সাল থেকে এই পর্বতের বরফ গুলো প্রচুর পরিমাণে গলতে শুরু করে যা ২০০৯ সালে পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যায়। এর পেছনে দায়ী বৈশ্বিক উষ্ণতা।

৬. বলিভিয়ার পোপো হৃদ 

© NASA / Wikimedia Commons   © NASA / Wikimedia Commons

© NASA / Wikimedia Commons © NASA / Wikimedia Commons

বলিভিয়ার এই এক সময়ের শক্তিশালী এই হৃদটি ২০১৬ সালে জলবায়ু পরিবর্তন ও কাছাকাছি স্থানে কৃষি এবং খনিজ উত্তোলনের ফলে পুরোপুরি শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে যায়। এটা উল্লেখযোগ্য যে এটি ছিল লেকটির দ্বিতীয়বারের মতো অদৃশ্য হয়ে যাওয়া। এর আগেও প্রথমবারের মতো ১৯৯৪ সালে পুরোপুরি হারিয়ে গিয়েছিল পরবর্তীতে ভারী বৃষ্টির ফলে পুনর্জীবিত হয়েছিল। 

৭. ইন্দোনেশিয়ার রাজা আম্পাত দ্বীপপুঞ্জ অবস্থিত প্রবাল প্রাচীর

© Fabian Lambeck / Wikimedia Commons   © Fabian Lambeck / Wikimedia Commons

© Fabian Lambeck / Wikimedia Commons © Fabian Lambeck / Wikimedia Commons

প্রায় ১৬০০ বর্গ মিটার জুড়ে অবস্থিত প্রবাল প্রাচীরটি ২০১৭ সালে প্রমোদ জাহাজের চলাচলের কারণে পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায় এবং এখান থেকে আগের অবস্থায় ফিরে যেতে দশকের পর দশক সময় লাগতে পারে। অর্থমূল্যে এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৮.৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

৮. ডাকবিল, অরিগন

© Steven Pavlov / Wikimedia Commons   © OregonStateParks / facebook

© Steven Pavlov / Wikimedia Commons © OregonStateParks / facebook

অরিগন এ অবস্থিত এই ডাক দিলে প্রাকৃতিক ভাবে তৈরী পাথর এর একটি সুন্দর স্থাপত্য শৈলী পর্যটকদের কাছে খুবই আকর্ষণীয় স্থান বলে ২০১৬ সালের ২৯ আগস্ট এর আগ পর্যন্ত বিবেচিত ছিল। এর পরবর্তী সময়ে বেশ কিছু মানুষ দলবদ্ধভাবে সেখানকার বেড়া ভেঙে এই প্রাকৃতিক স্থাপত্যশৈলী টিকে ভেঙে ফেলে। এর কারণ ছিল তাদের কোন একটা বন্ধু এর আগে এই পাথরের আঘাতে পা ভেঙ্গে ফেলেছিলো।

৯. পন্ট ডি আর্টস, প্যারিস

© Brigitte ALLIOT / Wikimedia Commons   © francofolle / instagram

© Brigitte ALLIOT / Wikimedia Commons © francofolle / instagram

প্যারিসের সেইন নদীর উপর অবস্থিত এই বিখ্যাত বৃষ্টি ভালবাসার নিদর্শন স্বরূপ ব্যবহৃত হতো। পর্যটকরা এখানে এসে ভালোবাসার মানুষের নামে তালা লাগিয়ে চাবিটি নদীতে ফেলে দিত। কিছুদিন আগে সরকার সেখানকার সকল তালা সরিয়ে ফেলেন যেগুলোর মোট ওজন হয়েছিল ৪৫ টন। সরকার আশঙ্কা করছিল যে এই ওজনের ফলে বৃষ্টি ভেঙে নদীতে পড়তে পারে। পরবর্তীতে সরকার তালা লাগানোর রেলিং গুলোতে কাচের দেয়াল স্থাপন করেন যাতে মানুষ এখানে আর তালা লাগাতে না পারে।

১০. অস্ট্রেলিয়ার ওয়েডিং কেক রক

© Philip Terry Graham / Wikimedia Commons   © Tony Hugo / Wikimedia Commons

© Philip Terry Graham / Wikimedia Commons © Tony Hugo / Wikimedia Commons

২০১৫ সালে এই শিলা পর্বতটি প্রচুর জনপ্রিয় হয়েছিল পরবর্তীতে এই পর্বতটির স্থায়িত্বের চিন্তা মাথায় রেখে কতৃপক্ষ এটিকে বন্ধ করে দেন। কিন্তু বন্ধ, জরিমানা এমনকি পুলিশের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও পর্যটকদের এর চারপাশে ঘেরাও করা দেয়াল টপকে গিয়ে শীলা পর্বতটির উপরে উঠে ছবি তোলা কোনো ভাবে আটকানো যাচ্ছে না। এই শীলা পর্বতটি ততদিন পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে যতক্ষণ না এটা কোন প্রাকৃতিক কারণে হারিয়ে যাচ্ছে।

© NorskPolarinstitutt / facebook

© NorskPolarinstitutt / facebook

পৃথিবীর অনেক গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থানগুলি পর্যটকদের বিভিন্ন অনিয়মের ফলে আজ মারাত্মক রকম প্রাকৃতিকভাবে বৈচিত্র্যহীন এবং ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। এর পেছনে দায়ী করা হয় পর্যটকরা প্রচুর পরিমাণ এর ময়লা আবর্জনা ফেলেন গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক জিনিসপত্র নিজের সাথে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য চিত্রকর্মের উপর নিজের চিত্র প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন। অনেক দেশেই গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন স্থানগুলো অনেকটা ধ্বংস হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন দেশের সরকার এ সকল বিষয়ে সতর্ক হলেও পর্যটকরা কোনোভাবেই সতর্ক হচ্ছেন না। এজন্যই সময় এসেছে মানুষরূপী এলিয়েনদের ভিন গ্রহে পাঠিয়ে দেয়ার।



জনপ্রিয়