নিজের অপহরণের মূল হোতা যখন অপহরণকারী নিজেই!            নিজের অপহরণের মূল হোতা যখন অপহরণকারী নিজেই!

নিজের অপহরণের মূল হোতা যখন অপহরণকারী নিজেই এর নেপথ্যের কাহিনী অবাক করে দেয় !

অপহরণ একটি ঘৃণ্য এবং মারাত্নক শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যখন অপহরণকারী আত্মীয়-স্বজনের কাছে ফোন করে বা বার্তা পাঠিয়ে অপহৃতকে বিশাল মুক্তিপণের জন্যে হত্যা করার হুমকি দেয় সেই সময়টা অপহৃত এবং তার আত্মীয়-স্বজনের উভয়ের জন্যই খুবই সংকটময় মুহুর্ত। কিন্তু আপনি সেই বিষয়টাকে কিভাবে দেখবেন যখন অপহৃত নিজেই নিজের অপহরণের নাটক রচনা করেছে? বর্তমান সময়ে ভুয়া অপহরণ এত পরিমান বেড়ে গেছে যা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। এটা অদ্ভুত হলেও সত্য। চলুন আজ আমরা দেখব তেমনি কিছু ঘটনা যেখানে অপহৃত নিজেই নিজের অপহরণকারী। 

০৭. জেসিকা নর্ডকুইষ্ট  

Photo credit: Met Police

Photo credit: Met Police

জেসিকা নর্ডকুইষ্ট নামের এই মেয়েটি প্রেমিকের উপর প্রতিশোধ নিতে অপহরণের নাটক সাজিয়েছিল। ২০১৭ সালের জুলাই মাসে আলাস্কার ২৬ বছর বয়সী নারী জেসিকা নর্ডকুইস্ট মার্ক উইকস নামের একজন ব্যক্তির সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলেন। প্রসঙ্গগত মার্ক উইকস এবং জেসিকা দুজনেই আনরুলি নামের একটি লন্ডনভিত্তিক পাবলিক রিলেশন ফার্মে চাকরি করতো। তারা কিছুদিন একসাথে প্রেম করার পর তাদের মধ্যে ব্রেকআপ হয়ে যায়। জেসিকা ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নন। সে মনে মনে পরিকল্পনা করেন যে মার্ক উইকস কে সে দেখে নেবে। সে মার্ক উইকস এর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনতে লাগল। জেসিকা সেই প্রতিষ্ঠান সকল কর্মচারী কর্মকর্তাদের মার্ক উইকস এর বিরুদ্ধে অভিযোগ মেসেজের মাধ্যমে পাঠাতে লাগলো। সেই বার্তায় লিখেছিল যে মার্ক তাকে ধর্ষণ করে গর্ভবতী বানিয়েছে। সে আরো যুক্ত করেছিল যে প্রতিষ্ঠানের সব জেনেও এ বিষয়ে সব কিছু গোপন রাখার চেষ্টা করেছে।

শুধু তাই নয় জেসিকা মার্ক উইকস এবং তার ঘনিষ্ঠজনদের কাছে অনেক নোংরা বার্তা পাঠাচ্ছিল। এতে মার্ক উইকিস এর পারিবারিক এবং সামাজিক জীবন মারাত্মকভাবে জর্জরিত হয়ে পড়েছিল। জেসিকার এ ধরনের কর্মকাণ্ডে মার্ক উইকস সারারাত ঠিকভাবে ঘুমাতে ও পারতো না। এরপর যা ঘটল সেটা অকল্পনীয়। জেসিকা নিজেই মুখোশ পরে অপহরণকারী সেজে নিজের হাত পা বাঁধা নগ্ন ছবি তার বন্ধু, সহকর্মী এবং উইকস এর পরিবারকে পাঠাতে লাগলো। পুলিশ জেসিকার বাড়িতে গেলে একটি চিরকুট খুঁজে পায় যেখানে তাকে অপহরণ করার কথা লেখা ছিল। জেসিকার তৈরি এই খেলাটা দুদিন পর্যন্ত ঠিকঠাক ছিল‌। দুদিন পর তাকে স্কটল্যান্ডে একটা জায়গায় খুঁজে পাওয়া যায় যেখানে সে ঘুমাচ্ছিল। তার এই ঘৃণ্য অপরাধের কারণে ২০১৮ সালে তাকে সাড়ে চার বছরের সাজা দেয়া হয়েছে। 

০৬. ডা. মার্ক সালের্নো ব্যক্তিগত ও আর্থিক দ্বন্দের জন্য নিজের অপহরণের নাটক সাজিয়েছিলেন

Photo credit: National Missing and Unidentified Persons System

Photo credit: National Missing and Unidentified Persons System

২০০২ সালের মে মাসে ৪৫ বছর বয়সী ডা. মার্ক অ্যারিজোনার ফোনিক্স এ অপহৃত হন। অপহরণ হওয়ার তিনদিন পরে তাঁকে তার গাড়ীতে পেছনের ডিক্কিতে পেনসিলভানিয়া তে উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনা পুরো যুক্তরাষ্ট্রে একটা আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। ততক্ষণ যতক্ষণ কিনা মানুষ জানতে পারলো যে, তিনি আসলে কখনও অপহরণই হননি। তিনি পুলিশ এবং এফবিআইয়ের সদস্যদের বলেছেন অপহরণকারীরা তার গাড়ি চুরি করতে এসেছিল এবং তাকে জোরপূর্বক গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। যাই হোক এই মিথ্যাচার অবশেষে উন্মোচিত হলো। যখন সেখানকার লোকজন বলেছিল যে তাঁরা মার্ককে নিজের গাড়ির পেছনে নিজেকে বন্দী করতে দেখেছিল। তার পরিবার এবং উকিলরা জানিয়েছে যে সে অনেক দিন ধরেই হতাশায় ভুগছেন। অন্যদিকে মার্ক দাবি করে, সে এই অপহরণের নাটক সাজিয়েছিল ব্যক্তিগত এবং আর্থিক কিছু দ্বন্দ্বের বশবর্তী হয়ে। তার স্ত্রী আরো জানায় যে, সে এর আগে ও হোভার ড্যামে আত্মহত্যা করতে চেষ্টা করেছিল।পরবর্তীতে এই ঘটনার জন্য তাকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়।

০৫. আলেজন্দ্রো মারিও কোটস আমেরিকার নাগরিকত্ব লাভের আশায় নিজেই নিজের অপহরণ করে

Photo credit: Twin Cities Pioneer Press

Photo credit: Twin Cities Pioneer Press

২০১৮ সালের ১৭ এপ্রিল মিনিসোটার এসটি পল নামক স্থানে একজন বরফ সরানোর কাজে নিয়োজিত একজন চালক হাত-পা ও মুখ টেপ দিয়ে বাঁধা অবস্থায় একজন লোককে দেখতে পান। ৪৬ বছর বয়সী আলেজন্দ্রো মারিও কোটস নামের ব্যক্তিটি দাবি করেন তাকে অপহরণকারীরা একটা গাড়িতে করে হাত-পা ও মুখ বেঁধে সেখানে রেখে চলে যায়। দ্রুত সেখানে এফবিআইয়ের কর্মকর্তারা ছুটে যান। এবং তারা খুব শীঘ্রই এই ঘটনার গোমর উন্মোচন করলেন। মূলত আলেজান্দ্রো সুপরিকল্পিতভাবে আমেরিকার নাগরিকত্ব লাভের আশায় এমন কাজ করে। আলেজন্দ্র হচ্ছে মেক্সিকোর একজন অবৈধ অভিবাসন প্রত্যাশী যে অপরাধের শিকার হয়ে ইউ ভিসার মাধ্যমে আমেরিকার নাগরিকত্ব লাভের চেষ্টা করছিল। তাকে ২০০১ সাল এবং ২০১০ সালে এই অপরাধে আটক করে তার দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছিল।

০৪. ক্যালিফোর্নিয়ার ট্রাক ব্যবসায়ী মারিয়া গঞ্জালেস কর্মচারীদের বেতন দিতে না পারায় অপহরণের নাটক রচনা করেছিল

Photo credit: ABC News

Photo credit: ABC News

৩২ বছর বয়সী‌ মারিয়া গঞ্জালেস ক্যালিফোর্নিয়ায় একটি ট্রাকের ব্যাবসা চালান। ২০১৮ সালে তিনি দাবি করেন তাঁকে অপহরণ করা হচ্ছে ডাকাতি করা হয়েছে এবং ধর্ষণ করা হয়েছে। তিনি বলেন তিনি একটা রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন এবং দুটো কুকুর সামনে পড়ে যাওয়ায় তিনি গাড়ি থামান। সাথে সাথে দুজন মুখোশ পরিহিত মানুষ যাদের একজনের হাতে অস্ত্র ছিল তার গাড়ির ভেতর প্রবেশ করেন এবং তাকে তাঁদের নির্দেশনা মতো গাড়ি চালাতে বলেন। তিনি আরো দাবি করেন যখন তার হুঁশ ফিরে এলো তাঁর মাথায় আঘাত অনুভব করেন এবং তার অন্তর্বাস ভেজা অনুভব করেন। অর্থাৎ তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন তার কর্মচারীদের বেতন দেয়ার জন্য তিনি নয় ৯০০০ ডলার নিয়ে যাচ্ছিলেন সে নয় হাজার ডলার অপহরণকারীরা ডাকাতি করে নিয়ে গেছে। তদন্তকারীরা যখন বাড়ি আর গাড়ির কাছাকাছি কোন পায়ের চিহ্ন পাননি তখন বিষয়টা তাঁদের কাছে সন্দেহজনক মনে হয়। কারণ সেখানে শুধুমাত্র মারিয়ার পায়ের ছাপ ছিল। অন্যদিকে তার ব্যাগে অন্যান্য জিনিস না নিয়ে শুধুমাত্র টাকাগুলো নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং কোন এলোমেলো অবস্থা ও তৈরি হয়নি যা পুরোপুরি সন্দেহজনক ছিল। উপরন্তু মারিয়া কিভাবে সেখান থেকে পালাতে পেরেছিল সেটাও সে ব্যাখ্যা করতে পারেনি। পরবর্তীতে সিসিটিভি ফুটেজ থেকে তদন্তকারীরা পুরো বিষয়টা বুঝতে পারেন। আসলে মারিয়াকে কেউ কিডনাপ এ করেনি বরং সে কর্মচারীদের টাকা দিতে না পারার কারণে একটা নাটক সাজিয়েছিল।

০৩. ওকলাহোমার জনাথান মাইকেল ডেভিস ৩৭৫ ডলারের জন্য নিজেই নিজের অপহরণ করে 

Photo credit: Tulsa County Jail

Photo credit: Tulsa County Jail

২০১৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ৩৪ বছর বয়সী জনাথান মাইকেল ডেভিস কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। তাঁর আত্মীয়-স্বজন অপহরণকারীদের কাছ থেকে মুঠোফোনে বার্তা পেতে লাগলেন। যেখানে বলা হয়েছিল যে ডেভিসকে জীবিত অবস্থায় পেতে হলে ৩৭৫ ডলার মুক্তিপণ দিতে হবে। বিষয়টা হাস্যকর না? মাত্র ৩৭৫ ডলারের জন্য কেউ কাউকে কিডন্যাপ করে? শুরু থেকে বিষয়টা পুলিশের কাছে সন্দেহজনক লাগছিল। এবং পরবর্তীতে ছবিও পাঠানো হয়েছিল যেখানে ডেভিসের আঙ্গুল ভেঙে দেয়া হয়েছিল এমন বোঝান হচ্ছিল। দ্রুত মুক্তিপণের টাকা না দিলে তার বাকি আঙ্গুলগুলো ভেঙে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়। মার্চ ১ তারিখে ডেভিসের পরিবার পুলিশের শরণাপন্ন হয়। ঘটনার দিন রাতেই ডেভিসের ফোন নাম্বার আমেরিকার ওকলাহোমার তুলসা নামক শহরে একটি ক্যাসিনোতে ট্র্যাক করা হয়। পরবর্তীতে সেখানকার একটি পার্ক থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। মূলত ডেভিস নিজে সেই ক্যাসিনোতে জুয়া খেলছিল। হয়ত টাকা কমে যাওয়ায় সে এই নাটকটা করে।  

০২. জেসন হিলার নেশার টাকার জন্য নিজে নিজের অপহরণের নাটক সাজায় একজন সঙ্গীর সহায়তায় 

Photo credit: WJRT-TV

Photo credit: WJRT-TV

২০১৮ সালের অক্টোবরে আমেরিকার মিশিগানে ৪০ বছর বয়সী জেসন হিলারের পিতা মাতা একটা অচেনা নাম্বার থেকে ফোন করো গ্রহণ করেন। ফোনের ওপাশ থেকে যে খবরটা তাঁরা পেলেন সেটা মোটেও সুখকর ছিল না। হত ফোন যে করেছিল সে ছিল তাঁদের পুত্র জেসানের অপহরণকারী। অপহরণকারী জেসনের মাকে ১০০০ ডলার এবং যে জেসনের ব্যক্তিগত গাড়ি পাশাপাশি জেসনের বাবার কাছে ৫০০ ডলার মুক্তিপণ দাবি করে। জেসনের মা পুলিশকে বিষয়টা জানান। পুলিশের কথামতো ১০০০ ডলার মুক্তিপণ তিনি অপহরণকারীর পূর্বেই বলা নির্ধারিত জায়গায় রেখে আসেন। পুলিশ আগে থেকেই সেখানে সার্ভেইলেন্স ক্যামেরা লাগিয়ে রেখেছিল।

তারা দেখলেন অপহরণকারী গাড়ি নিয়ে আসলো মুক্তিপণ নিল এবং সে জায়গা দ্রুত ত্যাগ করল। পরবর্তীতে পুলিশ ফুটেজ নিয়ে যে সেনের মায়ের কাছে যায়। এবং জেসনের মা মুক্তিপণ না লোকটাকে জেসন বলে শনাক্ত করেন। এখন পুরো বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গেল। যে আসলে এই নাটকটা জেসন নিজে সাজিয়েছিল। পুলিশ তাকে এবং তার এই কর্মে সহযোগী মাইকেল ফোরস্টারকে গ্রেফতার করে। এবং জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে জেসন মাদকাসক্ত আর এই টাকা তার নেশা করার জন্য দরকার। 

০১. হিলারি ব্ল্যাক 

 Photo credit: Gwinnett County Police Department

Photo credit: Gwinnett County Police Department

২০১৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর জর্জিয়ার ৩৩ বছর বয়সী হিলারির 911 ইমারজেন্সিতে কল করেন। তিনি বলেন তাকে অপহরণ করা হয়েছে এবং তার কাছ থেকে অর্থ ডাকাতি করা হয়েছে পাশাপাশি তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। এবং তিনি অভিযোগে আরো বলেন যে, তাঁকে জোর করে তাঁর গাড়িতে উঠিয়ে একটা শপিং সেন্টারে দিকে চালিয়ে যেতে বলা হয়। তার কাছে থাকা ১৪০০ ডলার ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং তাকে সেখানে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। গিনেট কান্ট্রি পুলিশ ডিপার্টমেন্ট তার অভিযোগ অনুসারে তদন্ত চালায়।

তাঁরা দ্রুত উপলব্ধি করলেন যে শপিং সেন্টারের কথা ব্ল্যাক উল্লেখ করেছে সেটার আসলে বাস্তবে কোন অস্তিত্ব নেই। এবং সার্ভেইলেন্স ক্যামেরা ও এটাই স্পষ্ট দেখায় যে ,যখন সে এটিএমে ছিল তখন তার কাছে কেউ ই আসেনি। তাঁর গাড়িতে কোন ধরনের ডিএনএ ফ্লুইড কিংবা অন্য কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি যার সাহায্যে এই অপরাধের সত্যতা যাচাই করা যেতে পারে। পরবর্তীতে সে নিজে নিজেকে কিডন্যাপ করে নাটক সাজানোর কথা স্বীকার করেন। 

আমাদের আয়োজন ভালো লাগলে বেশি বেশি লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করে আমাদের সাথেই থাকুন। 

 



জনপ্রিয়