সম্রাটগণ যারা নিজ সন্তানদের হত্যা করেছিলেন!    সম্রাটগণ যারা নিজ সন্তানদের হত্যা করেছিলেন!

সম্রাটগণ যারা নিজ সন্তানদের হত্যা করেছিলেন!

শাসকদের হাতে প্রজা হত্যা নতুন কোন বিষয় নয়। কিন্তু শাসকরা যখন তাদের নিজের সন্তানদের হত্যা করে?কোন শাসকের সন্তান হওয়ার ফল কতটা ভয়াবহ তা এই খুনী শাসকদের কথা না জানলে আমরা জানতেই পারতাম না। যাদের কাছে সন্তানের চেয়ে সিংহাসন ই বড় তাঁদের পক্ষে এমন জঘন্য কার্য সম্পাদন অসম্ভব নয়।

১. চতুর্থ ইভান এবং ইভান ইভানোভিচ

Photo credit: Ilya Repin

Photo credit: Ilya Repin

১৫৮১ সালে রাজা চতুর্থ ইভান তার অন্তঃসত্ত্বা পুত্রবধূ ইয়েলেনা শেরেমেতেভাকে অশালীন পোশাক পরিধানের জন্য বেত্রাঘাত করেন, এর ফলে তার গর্ভপাত হয়েছিল। তার দ্বিতীয় পুত্র জারেভিচ ইভান ইভানোভিচ এই ঘটনা জানার পর তার সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হলে, ইভান তার পুত্রের মাথায় আঘাত করে মারাত্মকভাবে জখম করেন এবং তার পুত্র মারা যায়। চতুর্থ ইভান তাঁর জীবদ্দশায় যত ভয়ঙ্কর কাজ করেছিলেন তাঁর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও নির্মম কাজটি ছিল নিজের হাতে একমাত্র সন্তানকে হত্যা করা।

২. হেরোড দ্যা গ্রেট এবং তাঁর পুত্র, আলেকজান্ডার এবং অ্যারিস্টোবুলাস

Photo via Wikimedia

Photo via Wikimedia

খ্রিস্টানদের ধর্মগ্রন্থ বাইবেলে হেরোড দ্যা গ্রেটকে নেতিবাচকভাবে চিত্রায়িত করা হয়েছে এবং তাকে "নিষ্পাপদের হত্যাকারী" হিসেবে গস্পেল অফ ম্যাথিউয়ের নতুন ভাগে আখ্যায়িত করা হয়েছে। যিহুদার রাজা হওয়ার ফলে হেরোড বেথলেহেমের আশেপাশে ২ বা তার চেয়ে কম বয়সের সমস্ত ছেলে শিশু হত্যার আদেশ দিয়েছি্লেন কোন সুনির্দিষ্ট কারণে। 

তিনি আন্টিপটার দ্য এডুমিয়ান নামক একজন উচ্চ-পদের রোমান কর্মকর্তার ঘরে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। হেরোড দ্য গ্রেট পবিত্র মন্দির সহ পুরো জেরুজালেম পুনর্নির্মাণ করেছিলেন এবং হেলেনিস্টিক সংস্কৃতির প্রসার ঘটিয়েছিলেন। তাকে পুরোপুরি পশু বলা যায় না, কিন্তু তিনি বছরের সেরা পিতার পুরস্কার পাওয়ার ও যোগ্য  ছিলেন না। অন্যান্য প্রজাদের বাচ্চাদের হত্যা করার পাশাপাশি হেরোড দ্য গ্রেট তাঁর নিজের সন্তানদের হত্যা করেছিলেন।

৩. সম্রাজ্ঞী আইরিন এবং ষষ্ঠ কনস্টান্টাইন

Photo via Wikimedia

Photo via Wikimedia

৭৭১ সালের ১৪ই জানুয়ারি  আইরিন বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের প্রথম মহিলা শাসক পদ লাভের আগে তিনি ষষ্ঠ কনস্টান্টাইন নামে একটি ছেলেকে জন্ম দিয়েছিলেন। তিনি এথেন্সের সম্ভ্রান্ত পরিবার থেকে এসেছিলেন। আইরিন তার পুত্র একদম ছোট হওয়ার কারণে রাজ্যের দায়িত্ব তিনিই নিয়েছিলেন। ৭৯০ খ্রিস্টাব্দে কনস্টানটাইন যখন রাজ্যশাসন গ্রহণের উপযুক্ত হয়েছিল তখন পুত্রের হাতে ক্ষমতা পুরোপুরি হস্তান্তর করতে না চাওয়ায় আইরিনের বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থান হয় ও তাকে সহ-শাসক পদ থেকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।

কিন্তু শাসক হিসেবে সফলতা পাননি কনস্টানটাইন। বুলগার ও আরবদের সাথে পরপর দুটি যুদ্ধে পরাজয় তাকে জনগণের কাছে অপ্রিয় করে তোলে।নিজের সিংহাসন বাঁচাতে ৭৯২ খ্রিস্টাব্দে পুনরায় তিনি আইরিনকে সহ-শাসক পদে বহাল করেন। তবে আইরিন এবার পূর্ণরূপে ক্ষমতা দখলের হিসেব কষতে থাকেন।৭৯৭ খ্রিষ্টাব্দে নিজ পুত্রের বিরুদ্ধেই তিনি ষড়যন্ত্র করেন। এই ষড়যন্ত্রে অনেককেই পাশে পান আইরিন, যারা কনস্টানটাইনের স্বৈরাচারী মনোভাবে ও কাজকর্মে বেশ বিরক্ত ছিল।

বিশেষ করে পুনরায় বিয়ে করে পুত্র না হবার কারণ দেখিয়ে সেই স্ত্রী ও কন্যাদের নির্বাসিত করা ও রানীর সহচরীর সাথে অনৈতিক সম্পর্কে জড়ানোর ফলে তিনি বিপুল পরিমাণ সমর্থন হারান। এই সুযোগই কাজে লাগান আইরিন। পুত্রকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ষড়যন্ত্র করেন। টের পেয়ে কনস্টানটাইন পালিয়ে যান। কিন্তু তাকে ধরে আনা হয় এবং আইরিনের নির্দেশে চোখ উপড়ে নেয়া হয়। এর যন্ত্রনায় কিছু সময় পরেই কনস্টানটাইনের মৃত্যু ঘটে।

৪. কনস্টান্টাইন দ্যা গ্রেট এবং ক্রিসপাস

Photo credit: katie chao and ben muessig

Photo credit: katie chao and ben muessig

সম্রাট কনস্টান্টাইন দ্যা গ্রেট রোমান দেবতাদের পুজা এবং খ্রিষ্টানদের ওপর অত্যাচারের অবসানের মাধ্যমে সম্পূর্ণ রোমান সাম্রাজ্যকে খ্রিষ্টান ধর্মে রূপান্তরিত করেছিলেন। তিনি তার জীবনের বেশিরভাগ সময়ই একজন পৌত্তলিক হিসেবে জীবনযাপন করেলেও মৃত্যুর আগে তিনি সেই খ্রিষ্টান ধর্মেই দীক্ষিত হয়েছিলেন যা তিনি অতীতে সবচেয়ে ঘৃণা করতেন।তিনি খ্রিস্টানরা যাতে তাদের ধর্ম অনুশীলন করার জন্য কোন রকম বাধাপ্রাপ্ত না হয় সে জন্য তিনি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চুক্তির মাধ্যমে ও ঘোষণা দিয়েছিলেন।

তিনি মিলানে  খ্রিষ্টানদের মুক্ত করতে এবং তাঁরা যাতে তাঁদের ধর্ম পালনে বাধাপ্রাপ্ত না হয় উল্লেখ করে ডিক্রি জারি করেছিলেন। তাঁর ছেলে ছিলেন ক্রিসপাস যে কিনা তাঁর আর্মি বাহিনীর নেতা ছিলেন। যাই হোক সব ঠিক চলছিল। হঠাৎ কনস্টান্টাইন দ্যা গ্রেটকে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী ফস্টার অভিযোগ করেছেন যে ক্রিসপাস তাকে ধর্ষণ করার চেষ্টা করছেন। কনস্টান্টাইন রাগের মাথায় কোন কিছু তদন্ত না করেই নিজের আদরের সন্তান  ক্রিস্পাসকে হত্যা করেন। পরে কনস্ট্যান্টাইন জানতে পারলেন তাঁর ২য় স্ত্রীর অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক ছিল। এজন্য কনস্ট্যান্টাইন ফস্টারকে গোসলখানায় পানিতে চুবিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছিলেন। 

৫. পার্সিয়ার আব্বাস (I) ও মোহাম্মাদ বাকের মির্জা

Photo via Wikimedia

Photo via Wikimedia

আব্বাস সাফাভিড রাজবংশের শ্রেষ্ঠ শাসক, সাফাভিড ইরানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রাজবংশ গুলোর মধ্যে অন্যতম। তিনি সামরিক বিষয়ে প্রতিভাসম্পন্ন ছিলেন যিনি তাঁর দেশকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে রক্ষা করেছিলেন। সেখান থেকে সমৃদ্ধ শহর নির্মাণ করেছিলেন এবং তাঁর দেশে খ্রিস্টানদের স্বাগত জানিয়েছিলেন।

তিনি বিদেশী জাতির লোকদের থেকে শিখতে খুব পছন্দ করতেন, বিশেষকরে ইউরোপের লোকদের থেকে কারণ তিনি জ্ঞানপিপাসু ও বৈচিত্রে বিশ্বাসী ছিলেন। আব্বাসের পুত্র যুবরাজ মোহাম্মদ বাকের মির্জা যাকে তাঁর খ্রিস্টান সার্কাসিয়ান স্ত্রীদের মধ্যে একজন জন্ম দিয়েছিলেন। সেই পুত্র নিজ পিতার বিরুদ্ধে আদালতের এবং সার্কাসিয়ানদের সাথে ষড়যন্ত্রে সামিল হয়েছিলেন। এই রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে আব্বাস তার উত্তরাধিকারী একমাত্র সন্তানকে নিজ হাতে হত্যা করেন এবং ছেলের পরিবর্তে তার নাতিকে সিংহাসনে বসান।

৬. স্পেনের ফিলিপ (II) ও ডন কার্লোস

Photo credit: Workshop of Titian

Photo credit: Workshop of Titian

স্পেনের সম্রাট ফিলিপের  দ্বিতীয় স্ত্রী পর্তুগালের মারিয়া ম্যানুয়েলা একটি পুত্রসন্তান প্রসবের পর মারা যান।সেই পুত্র ডন কার্লোস ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিল। তাঁর একটি পা ছিল ছোট, দুটো কাঁধ ছিল ভিন্ন উচ্চতার পাশাপাশি তার মানসিক ঘাটতিও ছিল। উদাহরণস্বরূপ, ডন কার্লোস তার ঘোড়াগুলিকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সওয়ার করাতেন এবং ছোট্ট মেয়েদের নির্যাতন করতেন। হীরা অপছন্দ করত। জন্মসুত্রে পিতার পর সিংহাসনের উত্তরাধিকারী কার্লোস, কিন্তু এটা স্পষ্ট ডন কার্লোস রাজা হওয়ার যোগ্য ছিলেন না। ১৫৬৮ সালে, ডন কার্লোসকে তার নিজের বাবা রাজা ফিলিপ বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করেন বলে ধারণা করা হয়। 

৭. পিটার (I) ও এলেকজি 

Photo credit: Paul Delaroche

Photo credit: Paul Delaroche

পিটার দ্য গ্রেটকে পিটারের নামে নামকরণ করা হয়েছিল, যিশু খ্রিস্টের ১২ জন মনোনীতদের মধ্যে একজন ছিলেন তিনি। পিটার দ্য গ্রেট এর লক্ষ্য ছিল রাশিয়াকে পরাশক্তি বানানো এবং দেশের আধুনিকীকরণ করা। উদাহরণস্বরূপ, তিনি তাঁর শাসনামলে ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা প্রচারের জন্য অসংখ্য ধর্মনিরপেক্ষ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা করেছিলেন।

যদিও তিনি তার লক্ষ্য অর্জনে অব্যাহত ছিলেন, বাবার ভূমিকা পালন ছিল তাঁর জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। পিটারের স্ত্রী সম্রাজ্ঞী ইউডক্সিয়া একজন অশিক্ষিত ও রক্ষণশীল মহিলা ছিলেন পাশাপাশি বিদেশীদের অপছন্দ করতেন।স্বাভাবিকভাবেই, তিনি পিটারের সংস্কারের গভীরভাবে বিরোধিতা করেছিলেন এবং এমনকি তাঁর বিবাহবহির্ভুত সম্পর্ক ও ছিল। পিটার নিজেও ধোয়া তুলশী ছিলেন না। কারণ সে ও অন্য নারীদের সাথে পরকীয়া করতেন। 

ইউডক্সিয়া তাঁদের পুত্র এলেকজির শিক্ষা যাতে বাইবেল পাঠ্যক্রম এবং অন্যান্য ধর্মীয় পাঠগুলির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে সে বিষয়টা নিশ্চিত করেছিলেন। পিটার ইউডক্সিয়ার সাথে দূরত্বের কারণে এলেকজির প্রতি মনযোগী ছিলেন না। এলেকজি তাঁর পিতা পিটার দ্য গ্রেটকে ভালবাসত না বরং তাকে হুমকি হিসেবে দেখতো। এলেকজির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ প্রমানিত হয় যার ফলে তাঁর পিতা পিটার দ্যা গ্রেটের আদেশে অমানুষিক নির্যাতন করা হয় এবং মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়।

আপনাদের আনন্দ দিতেই আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। যদি আমাদের আয়োজন ভালো লাগে তাহলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন।



জনপ্রিয়