এ.পি.জে  আব্দুল কালাম এ.পি.জে আব্দুল কালাম

এ.পি.জে আব্দুল কালাম হারিয়ে যাওয়া কোন ধুমকেতুর নাম নয়।

এ পি জে আবদুল কালাম এক অনুপ্রেরণার নাম, হঠাৎ আকাশে জেগে ওঠা এবং সহসা হারিয়ে যাওয়া কোনো ধূমকেতুর নাম নয়। এ পি জে এক জীবন্ত ইতিহাস, কিংবদন্তি, আদর্শবাদী, অসাধারণ ব্যক্তিত্বের এক চমৎকার প্রতিচ্ছবি। এ পি জের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় তাঁর ‘Wings of Fire’ বইয়ের মধ্য দিয়ে। একজন মানুষ কীভাবে শূন্য থেকে মহাশূন্যে উঠতে পারে, তার সবচেয়ে বড় এক দৃষ্টান্ত হলো এ পি জে। নাদের মাঝির ছেলে এ পি জে আবদুল কালাম ভারতের রাষ্ট্রপতি, ভাবাই যায় না। জীবনে বারবার হেরে গিয়ে জিতেছেন। মনোবল হারাননি শিশুর মতো কোমল হৃদয়ের অধিকারী এই অসাম্প্রদায়িক মানুষটি। খেয়ে-না খেয়ে বেড়ে ওঠা তামিলনাড়ুর সেই এলোমেলো চুলের কালো মানুষটি কালোমানিকে পরিণত হয়েছিলেন। এ পি জে ছিলেন দারুণ প্রতিভাবান এক বাগ্মী।

তাঁর বাকচাতুর্য মনকে ভরিয়ে দেয়, হৃদয়কে করে ইস্পাতসদৃশ, আকুঞ্জন দৃষ্টিকে করে প্রসারিত। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে যেতেন তরুণদের জাগিয়ে তুলতে, তাদের ভেতরের জীবটি লালন-পালন করার জন্য। ছাত্রছাত্রীদের কাছে খুবই জনপ্রিয় সাধারণ পোশাকের মোড়কে থাকা এই অসাধারণ মানুষটি। সুযোগ পেয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি হয়ে ভারতের দায়ভার নেওয়ার। সেবা দিয়ে গেছেন সুচারুভাবে। দুর্নীতির কালো বিড়াল টলাতে পারেনি পাহাড়সম ব্যক্তিত্বের এই মহামানবকে। পিঁপড়ার কি সাধ্য পাহাড়কে উপদেশ দেয়, ছারপোকার খোঁজ রাখে, গুবরেপোকার অনুসন্ধান করে! শিশুসুলভ এই মানুষটি অকপটে মিশে গেছেন সাধারণের ভেতর। কোট-টাই পরা শুরু করেছিলেন রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর। পোশাকে ছিলেন সাধারণ, কিন্তু ব্যক্তিত্বে ছিলেন অসাধারণ।

 

ভারতের ১১তম রাষ্ট্রপতি এ পি জে যেদিন রাষ্ট্রপতি ভবন ছেড়েছিলেন, সেদিন সেই জিনিসগুলোই তাঁর সঙ্গে ছিল, যেগুলো তিনি ভবনে প্রবেশের সময় সঙ্গে নিয়েছিলেন। তিনি অনুকরণীয় এবং দারুণভাবে অনুসরণীয়। এ পি জে ২০১৪ সালের ১৭ অক্টোবর বাংলাদেশে এসেছিলেন। আমরা জানতে পেরেছিলাম যেদিন উনি প্রস্থান করেছিলেন। প্রিন্ট মিডিয়া কিংবা অনলাইন নিউজপেপারগুলো তাঁর সম্পর্কে তেমন কিছুই প্রচার করেনি। অথচ কত নতুন নামের, নতুন ঢঙের অনলাইন পেপার আমাদের দেশে রয়েছে, যেখানে নানা ধরনের মুখরোচক সংবাদ পরিবেশন করা হয়। সানি লিওন বাংলাদেশে আসবেন বলে একটুখানি ঝুল দিয়েছিলেন, অমনি আমাদের ধ্বজভঙ্গ সংবাদপত্রগুলো একটু নড়েচড়ে বসল। আসলে পৃথিবীতে ভালো যত কম হয় ততই ভালো, তা না হলে সে নিজেদের ভিড়ের ঠেলায় হয়ে যেত মাঝারি।

 

মিসাইল ম্যান এ পি জে ছিলেন দারুণ সাদাসিধে টাইপের মানুষ। কাজের ভারে বিয়ে করার সময় মেলাতে পারেননি। দেশের জন্য অকাতরে শুধু নিজেকে সঁপে দিয়েছেন। অকুতোভয় আপসহীন দেশপ্রেমিক গদির লোভে কখনো নিজেকে অল্পদামে বিকিয়ে দেননি। নিজেকে সাধারণের কাতারে দাঁড় করিয়ে সবকিছুর চুলচেরা বিশ্লেষণ করতেন। সম্ভবত এ জন্য এই নিরহংকারী মানুষটি ‘জনগণের রাষ্ট্রপতি’ হতে পেরেছিলেন। এই সাদাসিধে গোবেচারা টাইপের মানুষটি জীবনের আনন্দ খুঁজেছিলেন কাজের মাঝে। কাজই তাঁকে অমর করে রেখেছে। এ পি জে দারুণ আত্মবিশ্বাসী একজন মানুষ। যে রাজ্যে তিনি পদচারণা করেছেন, তা সুশোভিত করেছেন। তাই তো তাঁর অবদানকে আরো তাৎপর্যমণ্ডিত করতে তিনি তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতেন নিজের চিন্তাচেতনার কথা। তরুণদের মনে দারুণভাবে দাগ কেটেছিলেন আধুনিক বিজ্ঞানের এই মহীরুহ। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে তরুণ-তরুণীদের মনকে আন্দোলিত করতে ছুটে যেতেন। তিনি স্বপ্ন দেখাতেন তরুণদের।

তাঁর ‘Wings of Fire’, ‘Turning Points’ কিংবা ‘Ignited Minds’ যুবসমাজের মধ্যে সহসা যে শক্তি জুগিয়েছে, তা আসলে ঈর্ষণীয়। অথচ কে জানত, নাদের মাঝির ছেলে ভারতের রাষ্ট্রপতি হবেন! কত দিন খেয়ে-না খেয়ে পড়াশোনা করেছেন। দুঃখকে তিনি জয় করেছেন তাঁর সৎ চেষ্টা দ্বারা। হারতে হারতে জিতে যাওয়া এই মানুষটি একসময় চেয়েছিলেন পাইলট হবেন। কিন্তু হয়েছিলেন পরমাণুবিজ্ঞানী। ভারতের পারমাণবিক ক্ষেত্র সাফল্যের চূড়ায় আরোহণ করেছে যে ব্যক্তিগুলোর হাত ধরে, তার মধ্যে এ পি জের ভূমিকা সর্বাগ্রে বিদিত। এ পি জে সম্ভবত একবিংশ শতাব্দীতে ভারতের সেরা আবিষ্কার! পেছনে না তাকিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখাতেন তিনি।

 

আধুনিক ভারতের রূপকার এ পি জে মনে করতেন, পৃথিবীর সব মানুষ সমান। মিডিয়ায় বিতর্কিত কমেন্ট করে কখনো পত্রিকার শিরোনাম হননি। তাঁর ‘Wings of Fire’ অন্যতম বেস্ট সেলার। ১০ লাখের বেশি কপি বিক্রি হয়েছে এ বইটি। তাঁর লেখা জ্ঞানের এমন আধার, যার ভেতরে ধার ও ভার দুটিই আছে। আসলে যে পারে, সে পারে। একাধারে তিনি একজন বিজ্ঞানী, রাষ্ট্রপতি, বক্তা, লেখক সর্বোপরি একজন ভালো মানুষ। জীবনে বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন, তবে সমাজকে দূষিত করে নয়। তাঁর জীবনের সবচেয়ে সেরা পুরস্কার মানুষের ভালোবাসা। তাঁর কর্মময় জীবনের জন্য তিনি বেঁচে থাকবেন কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে।

 

তার জীবদ্দশায় ৮৪ বছরের দীর্ঘ ও সফল কর্মজীবনে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও দর্শন থেকে আমাদের জন্য রেখে গেছেন অসংখ্য মহামূল্যবান বানী। তার থেকে বাছাইকৃত কিছু বানী সবার জন্য নিচে তুলে ধরা হল:-

১. স্বপ্ন বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তোমাকে স্বপ্ন দেখতে হবে। আর স্বপ্ন সেটা নয় যেটা তুমি ঘুমিয়ে দেখ, স্বপ্ন হল সেটাই যেটা পুরণের প্রত্যাশা তোমাকে ঘুমাতে দেয় না।

২. তুমি তোমার ভবিষ্যত পরিবর্তন করতে পারবে না কিন্তু তোমার অভ্যাস পরিবর্তন করতে পারবে এবং তোমার অভ্যাসই নিশ্চিত ভাবে তোমার ভবিষ্যত পরিবর্তন করবে।

৩. একটি ভাল বই একশত ভাল বন্ধুর সমান কিন্তু একজন ভাল বন্ধু একটি লাইব্রেরীর সমান।

৪. সফলতার গল্প পড়ো না কারন তা থেকে তুমি শুধু বার্তা পাবে। ব্যার্থতার গল্প পড় তাহলে সফল হওয়ার কিছু ধারনা পাবে।

৫. জাতির সবচেয়ে ভাল মেধা ক্লাসরুমের শেষ বেঞ্চ থেকে পাওয়া যেতে পারে।

৬. জীবন এবং সময় পৃথিবীর শ্রেষ্ট শিক্ষক। জীবন শিখায় সময়কে ভালভাবে ব্যবহার করতে সময় শিখায় জীবনের মূল্য দিতে।

৭. তোমার কাজকে ভালবাস কিন্তু তোমার কোম্পানিকে ভালবাসো না। কারন তুমি হয়ত জান না কখন কোম্পানিটি তোমাকে ভালবাসবে না।

৮. তুমি যদি সূর্যের মতো আলো ছড়াতে চাও, তাহলে আগে সূর্যের মতো জ্বলো,

৯. ছাত্রজীবনে বিমানের পাইলট হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণে ব্যর্থ হয়ে, হয়ে গেলাম রকেট বিজ্ঞানী

১০. জীবন হলো এক জটিল খেলা। ব্যক্তিত্ব অর্জনের মধ্য দিয়ে তুমি তাকে জয় করতে পার।

১১. জটিল কাজেই বেশি আনন্দ পাওয়া যায়। তাই সফলতার আনন্দ পাওয়ার জন্য মানুষের কাজ জটিল হওয়া উচিত।

১২. পরম উৎকর্ষতা হলো একটি চলমান প্রক্রিয়া। এটা হঠাৎ করেই আসে না। ধীরে ধীরে আসে।

১৩. যারা মন থেকে কাজ করে না, তাঁরা আসলে কিছুই অর্জন করতে পারে না। আর করলেও সেটা হয় অর্ধেক হৃদয়ের সফলতা। তাতে সব সময়ই একরকম তিক্ততা থেকে যায়। 

১৪. জীবন হলো একটি জটিল খেলা। ব্যক্তিত্ব অর্জনের মধ্য দিয়ে তুমি তাকে জয় করতে পার।

১৫. আমরা তখনই স্মরণীয় হয়ে থাকবো, শুধুমাত্র যখন আমরা আমাদের উত্তর প্রজন্মকে উন্নত ও নিরাপদ ভারত উপহার দিতে পারবো।

প্রত্যেক সফল মানুষের জীবন থেকেই আমরা কিছু না কিছু শিখতে পারি। ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা থেকে যেটা শেখা যায় বই পড়ে সেটা কখনোই শেখা যায় না। নিত্য নতুন কিছু জানার জন্য আমাদের সাথেই থাকুন..... 



জনপ্রিয়