ড. আতিউর রহমান এর সংগ্রামী জীবন ইতিহাস।    ড. আতিউর রহমান এর সংগ্রামী জীবন ইতিহাস।

রাখাল বালক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর !

নাম তাঁর আতাউর রহমান। অতি দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষক পরিবারের ছেলে। জন্ম জামামালপুর জেলার অজপাড়াগাঁয়ে। বাবা কৃষি কাজ করে ছা- পোষা জীবন-যাপন করেন। মা গৃহিনী। পাঁচ ভাই, তিন বোনের অভাব ক্লিষ্ট পরিবারে জন্ম এই স্বপ্নবাজের। কোনোমতে  দিন চলে তাদের। তাঁর মা সামান্য পড়ালেখা জানতেন। মায়ের কাছেই পড়ালেখার হাতেখড়ি তাঁর। পড়াশুনা শেখার জন্য বাড়ির পাশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন। নিদারুন অভাবী সংসার। তাঁর বড় ভাই আরো আগেই অভাবের তাড়নায় স্কুল ছেড়েছেন। তাঁর পরিণতি আর কি হবে? অভাব যেন তাঁকেও আর এগুতে দেবেনা। ক্লাশ থ্রি পর্যন্ত উঠার পর পড়ালেখার সামান্য খরচ চালানোই দায় হয়ে গেলো। কি আর করা। সুবোধ বালকের স্বপ্ন ভেঙ্গে গেলো। লেখাপড়া ছেড়ে রোজগারের পথে নেমে গেল শিশুটি।

গরীব বাবার সংসারে সম্বল বলতে ছিলো একটা দুধাল গাভী আর কয়েকটা খাসি। সকাল থেকে সন্ধ্যা গাভী আর খাসির যত্নআত্মিই তাঁর একমাত্র কাজ। পুরোদস্তুর গ্রাম বাংলার রাখাল ছেলে। বিকেল হলেই গাভীর দুধ নিয়ে বাজারে গিয়ে দুধ বিক্রি। এই দুধ বেচার টাকা দিয়েই সংসার চলে। দুই-ভাই মিলেই করতো এই কাজ। কিছু টাকা সঞ্চয়ও হতো। এভাবে কিছুদিন যায়। কিছু টাকা জমা হয়। মাথায় আসে নতুন চিন্তা। ঘরে জমানো টাকা দিয়ে পান-বিড়ি কিনে দোকান দেয় সে। সকাল থেকে সন্ধ্যা চলে পুরোদস্তুর দোকানদারি।

এক বিকেলে বড় ভাই জানালো, আজ স্কুল মাঠে নাটক হবে। শুনে আতিউরের চোখ ছল ছল। কিভাবে সে নাটক দেখতে যাবে। তার তো গাঁয়ে পড়ার  মতো একটি জামাও নেই। মনে অনেক কষ্ট। তবুও অদম্য আতাউর। লুঙ্গি পড়া খালি গা অবস্থায়ই সে চলে গেলো নাটক দেখতে। নাটক দেখতে এসে তাঁর স্বপ্নের জাগরণ ঘটলো নতুনভাবে। নাটক উপক্ষ্যে সজ্জিত স্কুল প্রাঙ্গনের আনন্দময় আয়োজন তাঁকে অভিভূত করলো। পুরনো প্রেরণায় ফিরে এলো সে। আবারো স্কুলে যাবো আমি। স্কুলে আমায় যেতেই হবে। এই পণ করে সে আবার স্কুলে যাবার মনস্থির করলো।

সেদিন নাটক দেখে বাড়ি ফেরার পথে সে তার ইচ্ছের কথাটি বড় ভাইকে জানালো। আচ্ছা ভাইয়া, আমি কি আবার স্কুলে যেতে পারবো না? শুণে বড় ভাইয়ের মন স্নেহের সায় দিলো।বললো- ঠিক আছে, কাল দেখি হেড মাস্টারের সাথে আলাপ করে দেখব। বড় ভাই পরদিন ছোট ভাইটিকে নিয়ে স্কুলে গেল। আতাউরকে হেড স্যারের রুমের বাইরে দাঁড় করিয়ে বড় ভাই ভিতরে প্রবেশ করলো। আতাউর বাইরে থেকে সব শুণছে। বড় ভাই হেড স্যারকে বললেন- আতাউরকে যেন বার্ষিক পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়। হেড স্যার তাচ্ছিল্য করে বললেন সবাইকে দিয়ে কি আর লেখাপড়া হয়? স্যারের কথা শুণে মাথা নিচু হয়ে গেল আতাউরের। বুকভরা যে আশা নিয়ে সে স্কুলে গিয়েছিলো- তার সবটাই নিমিষে নিরাশার অতলে হারিয়ে গেল। ছোট ভাইয়ের মনের কথা ভেবে বড় ভাই অনেক আকুতি মিনতি করে শেষমেষ আতিউরের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করলেন।

পরীক্ষাও খুব দূরে নয়। মাত্র তিনমাস বাকি। এর মধ্যেই যা করার  করতে হবে। তাই বাড়ি ফিরে সে মায়ের কাছে বায়না ধরলো, তাকে যেন তিন মাসের ছুটি দেয়া হয়। এতটুকুন শিশু আতাউরের মনেও দরিদ্র বাবার সংসারের খাবার যোগানো কথা ভাবতে হয়েছে! মা-কে বললো আমি আর এখানে থাকব না। ঘরে খাবার নেই। পরণে কাপড় নেই। নেই কোনো বইপত্র। কিন্তু পরীক্ষায় তাকে পাস করতেই হবে। এই চ্যালেঞ্জের জেদ বাসা বাঁধল তার  কোমলমতি মনে। মা বললেন, কোথায় যাবি?  আমার এক সহপাঠীর নাম মোজাম্মেল। সে ক্লাশের র্ফাস্ট হয়। তার মায়ের সাথে আমার পরিচয় আছে। আমি তাদের বাড়িতে যাবো। ওর মা খুব ভালো। আমাকে আশ্রয় দিবে। একদিন ভয়ে ভয়ে সে গেলো সেই বন্ধু মোজাম্মেলের বাড়ি। বন্ধুর মা’কে সব কিছু খুলে বললো। মোজাম্মেলের মা সবশুণে রাজি হয়ে গেলেন। এবার আতিউরের আলোর ভুবনে নতুন জীবন শুরু। হেড স্যারের  সেই কথা তাঁর কানে বাজে। নিজের সাথে প্রতিজ্ঞা করে সে। সফল হয়ে হেড স্যারের সেই কথা, সেই ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করতেই হবে।

স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্য নিয়ে পড়াশুনা করে সে। পরীক্ষাও শুরু হয়। একটি করে পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়ে সে নিজের সাথে নতুনভাবে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে। এক এক করে পরীক্ষও শেষ হয়। দিন আসে ফল প্রকাশের দিন। সাহস ও উদ্দীপনা নিয়ে প্রথম সারিতে বসে আতাউর। যথারীতি হেডস্যার এলেন ফলাফলের শিট নিয়ে। দ্বিধায় থতমত হেডস্যার। চকিত কি যেন ভেবে অতঃপর ঘোষণা করলেন আতাউরের নাম। ক্লাসের সেরা ছাত্র সে। হেডস্যারের ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করার আনন্দে আতাউরের চোখে আনন্দ অশ্রু। খবর শুনে বড় গর্বিত বড় ভাইয়ের চোখে মুখে আনন্দের জোয়ার। অশ্রুসজল চোখে বিধাতার কাছে যেন কৃতজ্ঞতার প্রার্থনা।

সাফল্যের উচ্ছসিত হাসিমাখা মুখ নিয়ে বাড়ি আসার পথে আতাউর আর তার বড় ভাইয়ের পিছন পিছন ছেলে-মেয়েদের উল্লাসমুখর শ্লোগান যেন আনন্দে মাতোয়ার করে তুলেছে চারপাশের পরিবেশ।  সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। এই আনন্দ ছড়িয়ে গেল সারা গ্রামজুড়ে। আতিউরের নিরক্ষর বাবা, যার কাছে পাস বা ফেল, র্ফাস্ট বা লাস্ট হওয়ার তেমন কোনো অর্থ নেই।ছেলের সফলতায় চারপাশের লোকজনের আনন্দ দেখে আজ তিনিও আনন্দে আত্মহারা। খবর শুণে বেজায় খুশী দরিদ্র পিতার মন। ছেলে এক ক্লাস উপরে উঠেছে। নতুন বই লাগবে। এই অনুধাবন নিরক্ষর বাবার মনেও ঠিকই জেগেছে। তাই তিনি পরদিন সংসারের সম্বল খাসিটাকে বাজারে নিয়ে মাত্র ১২ টাকায় বিক্রি করে দিলেন। 
পরদিন ছেলেকে নিয়ে জামালপুর শহরের নবনূর লাইব্রেরি থেকে ছেলের জন্য নতুন বই কিনে দিলেন।

শুরু হলো শিক্ষা অর্জনে এক জ্ঞান তাপসের জীবন সংগ্রাম। ১৪ কিলোমিটার পথ পায়ে হেটে কখনোবা সাইকেলে চড়ে স্কুলে যেতে হতো। তবুও অদম্য সাহসী আতাউর থামেনি মুটেও। প্রতিদিন স্কুলে যায়, অবসরে কাজ করে। সাথে আছে ভালো ফলাফলের ঝুড়িটা। কাজেই স্কুলে সে শিক্ষকদের প্রিয়পাত্র। ফয়েজ মৌলভী স্যার তো তাঁকে সন্তানের মতোই দেখে। সবার আদরে, স্নেহের পরশে আর অনুপ্রেরণায় প্রথম স্থান অর্জন করেই পঞ্চম শ্রেণীতে উঠলো সে। এভাবেই প্রাথমিক শিক্ষা উচ্ছসিত সফলতার সাথে সমাপন হলো। ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হলো দিঘপাইত জুনিয়র হাই স্কুলে। গ্রামের একমাত্র মেট্রিক পাস মফিসউদ্দিন চাচার নেক নজর পড়লো তার উপর। চাচা ঐ স্কুলের শিক্ষক। তার বাড়িতেই আশ্রয় জুটলো। এভাবে শত প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে চলছে আতাউড়ের শিক্ষা সংগ্রাম।

আতাউর এবার অষ্টম শ্রেণীতে উঠবে। এমন সময় চাচা পেপার থেকে একটি বিজ্ঞাপন কেটে নিয়ে এলেন। বিজ্ঞাপনটি দেখিয়ে তাকে বললেন- এটা ক্যাডেট কলেজে ভর্তির বিজ্ঞাপন। আতাউরকে ক্যাডেটে পড়ার ব্যাপারে উৎসাহ যোগালেন তিনি। সেও যথা সময়ে ফরম পূরণ করে পাঠালো। ক্যাডেট কলেজে ভর্তির ফরমে স্কুলের হেড স্যার আতাউরের নাম পরিবর্তন করে আতিউর রহমান লিখে দিলেন। তিনি সগৌরবে বললেন- একদিন ও অনেক বড় হবে। হেড স্যার আতাউরের চাচাকে বললেন- দেশে অনেক আতাউর আছে, ও বরং ব্যতিক্রম হিসেবে আতিউর হয়ে থাক।

ক্যাডেটে পড়ার জন্য আতিউর রাত জেগে পড়ে আর পড়ে। অবশেষে এলো পরীক্ষার দিন। এ উপলক্ষ্যে আতিউর এই প্রথম ময়মনসিংহ শহরে যাচ্ছে। বিরাট ব্যাপার। মনে ভয়, বিস্ময় আর কৌতুহলের নয়নে অবিরাম জিজ্ঞাসা। শহরের চমকদার সৌন্দর্য আর আভিজাত্যে বিমুগ্ধ আতিউর ভীরু ভীরু মনে পরীক্ষা দিলো। মনে ভয়, পাস হবো তো!  পরীক্ষা দিয়ে চলে গেলো বাড়িতে। আর কোনো খবর নেই। সে ধরেই নিলো ক্যাডেটে পড়া হয়তো তার ভাগ্যে নেই। ভাবনা-দুর্ভাবনায় কেটে গেল দু-দুটি মাস। হঠাৎ একদিন পিয়ন এলো চিঠি নিয়ে। এ চিঠি যে সে চিঠি নয়। এই চিঠি ক্যাডেট কলেজে ভর্তির জন্য নির্বাচিত হওয়ার চিঠি। কি আনন্দ! হুর-রে-রে-রে।

তবে এবার চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য যেতে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট। এই খবরে সবাই খুশী হলেও আতিউরের খুশী যেন মাটি চাপা পড়লো! কারণ তার মাথায় চিন্তা ঢুকলো- তার তো একটা প্যান্ট নাই! কি পরে যাবে! তাই বলে এখবর পেয়ে তো আর পিছিয়ে থাকা যায়না। তাই স্কুলের কেরানির ছেলে কানাই লাল বিশ্বাসের ফুল প্যান্টটা ধার করলো। যোগাড় করা হলো একটি শার্ট। 
ব্যস্, আতিউর আর চাচা রঙিন ঢাকা শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। চাচা পথে যেত যেত শিখিয়ে শিখিয়ে নিচ্ছেন। কিভাবে কথা বলতে হবে। কিভাবে বসতে হবে। ইন্টারভ্যু কক্ষে প্রবেশের পূর্বে যে ইংরেজিতে বলতে হবে ‘ম্যা আই কাম ইন স্যার?’, সেটুকুও চাচা শিখিয়ে দিলেন। তারপরও বিপত্তি ঘটলো! ভয়ে খেই হারিয়ে ফেলেছে আতিউর। এত উচ্চকন্ঠে ‘ম্যা আই কাম ইন স্যার’ বললো যে শুনে উপস্থিত সবাই হো হো করে হেসেই খুন!!

আতিউর তো নার্ভাস হয়ে গেল। তবে কি, বিধি যেন আশার দূত পাঠালেন। এখানে পরীক্ষকদের একজনের নাম এম. ডাব্লিউ পিট। তিনি মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের অধ্যক্ষ। এই পিট স্যার আতিউরকে  আপাদমস্কত নিরীক্ষণ করে কি যেন আঁচ করতে পারলেন। অভয় দিয়ে পরম স্নেহে বসালেন তাঁকে। তাঁর লিখিত পরীক্ষার খাতায় চোখ বুলালেন। তারপর অন্যান্য পরীক্ষকদের সাথে ইংরেজিতে কথাবার্তা বললেন। তাদের সব কথা আতিউর না বুঝলেও সে এটুকু নিশ্চিত হলো যে স্যার তাঁকে পছন্দ করেছে। পরদিন ঢাকা শহর ঘুরে ফিরে বাড়ি ফিরে গেল সে। আবার পড়াশুনায় মনযোগ। সে ধরেই নিলো যে ক্যাডেটে তার চান্স হবেনা। এভাবেই চলছে লেখাপড়া। যেতে থাকলো রাত-দিন।

আবারো তিন মাস পর চিঠি এলো আশার আলোর বার্তা নিয়ে। আতিউর ক্যাডেটে চান্স পেল। খুশির খবরের সাথে ভাবনার একটি বিষয় আছে। ক্যাডেটে পড়তে মাসিক বেতন লাগবে ১৫০ টাকা। অবশ্য সে ১০০ টাকা বৃত্তি পাবে। বাকি ৫০ টাকা পরিবার থেকে দিতে হবে। পঞ্চাশ টাকা যোগানো চিন্তায় মন ভেঙ্গে গেল তার। যেখানে তিনবেলা খাবার জোটেনা, সেখানে ক্যাডেটে পড়ার ৫০ টাকা খরচ আসবে কোথা থেকে। আতিউরের দাদার আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ ছিলো। দাদা তার বাবাকে বাড়িতে ঠাঁই দেননি। দাদার বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে ছোট্ট একটি ছনের ঘরে কোনোমতে থাকতো তারা। মা তার বাবার বাড়ির অংশ বিক্রি করে এনে এখানে তিন বিঘা জমি কিনেন। এই জমিই একমাত্র সম্বল। এখানে নিজেরা চাষাবাদ করে যে ফসল পায় তা দিয়ে ৫ থেকে ৬ মাসের খোড়াকি চলে। চরম পোরাকাষ্ট দারিদ্র্যতা যে আষ্টেৃপৃষ্টে সখ্যতা বেঁধেছে আতিউরের জীবনে।

৫০ টাকার টানাপোড়েন। এর উপর নির্ভর করছে তাঁর ক্যাডেটে পড়া হবে কি হবেনা। আশা-নিরাশার দোলাচলে গোটা পরিবার। এমন সময় এই প্রথম দাদা তাঁর নাতির খবর নিলেন। অন্য চাচাদের কাছে তাকে নিয়ে বললেন তোমরা থাকতে নাতি আমার এত বড় একটা সুযোগ পেয়েও পড়তে পারবেনা!
তাদের অবস্থাও খুব ভালো ছিলোনা। তাই তারা না সূচক কিছু না বলে, দাদাকে জানালেন- না হয় ৫০ টাকা একবার যোগাড় করে দিয়ে দিলাম। কিন্তু প্রতি মাসে এত টাকার যোগান দেয়া কতটা সম্ভব? দাদাও ব্যাপাটা বুঝলেন। কি আর করা নিয়তির নির্মমতা মেনে নিতেই হলো।

আতিউর মৌলভী সারের কাছে গেল। স্যার তাঁকে অভয় দিয়ে বললেন- আমি আছি, কোনো চিন্তা করবে না। পরদিন স্যার আরো দুই সহকর্মীসহ তাঁকে নিয়ে হাটে গেলেন। সেখানে গামছা পেতে দোকানে দোকানে ঘুরে সাহায্য তুললেন। ওর গল্প শুণে সবাই এক আনা, দুই আনা, চার আনা, আট আনা, এক টাকা, দুই টাকা করে যে যার সামর্থ্য মতো সাহায্য করলেন। সবমিলিয়ে ১৫০ টাকা পূর্ণ হলো। চাচারা দিলেন আরো ৫০ টাকা।

এই দুই’ শ টাকা সম্বল হিসেবে নিয়ে ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হলো সে। যাতায়াত খরচ বাদ দিয়ে এই টাকায় তিন মাসের বেতন পরিশোধ হলো তাঁর। শুরু হলো অন্য এক জীবন। এ জীবন শুধুই স্বপ্নময়। এ জীবন সামনে চলার। ক্লাশের প্রথম দিন। সেই এম ডব্লিউ পিট স্যার তাঁকে দেখতে এলেন। স্যার-কে  সে সব খুলে বললো। স্যারকে সে জানিয়ে রাখলো যে তিন মাসের বেতন দেয়া হয়েছে। তিন মাস পর আর টাকা দেওয়ার কোনো উপায় নেই। তাই হয়তোবা আর পড়া হবেনা। গল্প শুণে স্যার ব্যাপারটি নিয়ে বোর্ড মিটিংয়ে আলোচনা করলেন। সিদ্ধান্ত হলো পুরো ১৫০ টাকাই তার জন্য বৃত্তি দেয়া হবে।

সেই থেকে আতিউরকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। এরপর সে এসএসসি পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডে  মেধা তালিকায় ৫ম স্থান অর্জন করলো। একের পর এক ভালো রেজাল্ট যোগ হতে থাকলো তার ভান্ডোতে। ধাপে ধাপে সফলতার সাথে এগিয়ে গেলো তার শিক্ষা সংগ্রাম। উচ্চতর অনেক অনেক ডিগ্রি, খেতাব যোগ হলো তাঁর আলোকিত জীবনে। পাল্টে গেলো তার জীবন সংগ্রামের দৃশ্যপট। স্বপ্নের মতো করে সবকিছু যেন সেজে-গুজে উঠতে লাগলো।

এতক্ষণ যাকে নিয়ে গল্প হলো সেই আতিউর রহমান বাংলাদেশের একজন শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ। তিনি বড় মাপের একজন গবেষকও। দারিদ্যতার সাথে জীবন সংগ্রামী এই শিক্ষানুরাগী আতিউর রহমান আর কেউ নন। তিনি অর্থনীবিদ ডক্টর আতিউর রহমান। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্ভর্ণর মহোদয়। দরিদ্রতার যাতনায় নিপীড়িত পরিবারের সন্তান হয়ে অদম্য সাহসী আতিউর রহমানের জীবন পট পরিবর্তনের রঙে গৌরবময়, নাটকীয় ও সার্থক।

এই সফল জীবন সংগ্রামীর জীবনজুড়ে অসংখ্য মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা, স্নেহ আর অনুদানের সাজানো ফসল। তিনি এখন নিজের এলাকায় স্কুল চালু করেছেন। কলেজ চালু করেছেন। সাহায্য, সহায়তা করছেন ইচ্ছেমতো। কিন্তু  সেই যে হাট থেকে তোলা ১৫০ টাকা তার আর পরিশোধ করা হলোনা। না থাকে, এই হৃদ্যতার ঋণ না হয় অমলিন হয়ে থাকুক তাঁর আজন্ম সাধনা ও স্বপ্নে...



জনপ্রিয়