পৃথিবী বদলে দেয়া এই মানুষেরা সহজে ভুলার নয়!    পৃথিবী বদলে দেয়া এই মানুষেরা সহজে ভুলার নয়!

পৃথিবী বদলে দেয়া এই মানুষেরা সহজে ভুলার নয়!

গত কয়েক শতাব্দী ধরে আমাদের পৃথিবী গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অধিকতর মানুষ উপলব্ধি করেন যে গ্রহটি বিপদের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু তাদের মধ্যে অনেকেই কোন পদক্ষেপ গ্রহণ না করে শুধু কথাই বলে, অনেকে আবার পরিবেশ রক্ষা করার জন্য অনেক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই সক্রিয় মানুষগুলো সৈকত পরিষ্কার করছে, সমুদ্রে যাওয়া আবর্জনা অপসারণের চেষ্টা করছে, পরিবেশবান্ধব শহর নির্মাণ করছে। 

আজকে আমরা বিভিন্ন দেশের মানুষ যারা পৃথিবী সংরক্ষণ করার চেষ্টা করে প্রতিদিন অলৌকিক ঘটনা সৃষ্টি করছে তাদের সম্পর্কে অনুপ্রেরণামূলক কিছু গল্প আপনাদের সাথে শেয়ার করছি। আসুন আমরা তাদের দেখে পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে আসি।  

১. ২০ বছর পর ভারতের একটি পরিষ্কার সৈকতে কচ্ছপেরা আবার ফিরে এসেছে 

© AfrozShah1   © SteveJurvetson

© AfrozShah1 © SteveJurvetson

মুম্বাইয়ের একটি চমৎকার সৈকত আবর্জনায় আবৃত ছিল। এর আগে এই সৈকত অলিভ কচ্ছপের জন্মস্থান ছিল। কিন্তু আবর্জনার কারণে তাদের অন্য অঞ্চলে যেতে হয়েছিল এবং পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে উঠেছিল। আফরোজ শাহ নামের এক লোক এই সৈকতে আসেন এবং আবর্জনা পরিষ্কার করতে শুরু করেন। স্বেচ্ছাসেবকেরা তাকে সাপোর্ট করেছে।

সৈকত থেকে তারা একসঙ্গে ৫০০০ হাজারেরও বেশি ময়লা-আবর্জনার অংশ পরিষ্কার করেন, জাতিসংঘ তাদের এই প্রকল্পকে প্রাণোদিত করার জন্য “সর্বাধিক সমুদ্র সৈকত পরিষ্কার প্রকল্প” নামে আখ্যায়িত করেন। এই বসন্তে প্রায় ২০ বছর পর কচ্ছপেরা এই পরিষ্কার সমুদ্র সৈকতে পুনরায় ফিরে এসেছে এবং ডিম পাড়ছে। প্রায় ১০০ কচ্ছপের জন্ম হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবীরা আশ্রয়ের জন্য আরব সাগরে যাওয়ার পথে কচ্ছপদেরকে রক্ষা করেছিল।

 

২. ‘ক্লিনম্যান’ (পরিষ্কার কর্মী) এক ঘন্টার মধ্যে ২৮ ব্যাগ আবর্জনা সংগ্রহ করতে পারে

© youtube

© youtube

মানুষ প্রায়শই প্রকৃতির বাকি ময়লা-আবর্জনার স্তূপ সম্পর্কে কথা বলে। রাশিয়ার চেলিয়াবিন্‌স্ক শহরের ক্লিনম্যান নামের একজন ব্যক্তি কথা বলার চেয়ে কাজ/পদক্ষেপ নিতে পছন্দ করেন। বন এবং পার্কের নোংরা, আবর্জনাপূর্ণ এলাকাগুলো তার পরিদর্শনের পর পুনর্জন্ম লাভ করে এবং তিনি তার পিছনে আবর্জনা ব্যাগের একটি দীর্ঘ সারি বহন করেন। তিনি যখন ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করার কাজে মনোযোগী ছিলেন তখন কোন এক ডাচ লোক সেটির ভিডিও করেন। এরপরে, অনেকেই তাকে অনুসরণ করেন। যখন তাকে মাস্ক সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তখন তিনি বলেন যে তিনি ইকোলজির সমস্যা মনোযোগ আকর্ষণ করতে চেয়েছিলেন, নিজেকে না।

তার নীতি খুবই সাধারণঃ ‘পরিষ্কার করা খুবই সহজ এবং এতে অপমানজনকের কিছু নেই’।

 

৩. ‘আফ্রিকার জন্য নলকূপ’ প্রকল্প

© WaterWellsforAfrica

© WaterWellsforAfrica

১৯৯৪ সালে, কার্ট ড্যালিন মালাউইতে যখন ছিলেন তখন তিনি দেখেছিলেন যে, মানুষ ময়লা পানি নিতে প্রতিটি বালতির জন্য যুদ্ধ করছে এবং মেয়েরা তাদের মাথায় জলেরপাত্র বয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় প্রচুর পানি পড়ে যাচ্ছে। তাই তিনি তাদের সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন: তিনি দরিদ্র ও শুষ্ক গ্রামে একটি নলকূপ স্থাপন করেছিলেন। এটি সেখানকার অধিবাসীদের তৃষ্ণা মিটিয়েছে এবং ময়লা পানি পান করা থেকে রক্ষা করে।

প্রথম ৪ বছরে, প্রকল্পটি ২৬ হাজার লোকের পানি সরবরাহ করে। ১০ বছর পর, সেখানে ৭৬ টি নলকূপ ছিল এবং তিনি ‘আফ্রিকার জন্য নলকূপ’ সংস্থা প্রতিষ্ঠান করেন। বর্তমানে, আফ্রিকাতে ৩ লাখেরও বেশি লোক বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করছে।  

 

৪. ফ্যাশন ব্র্যান্ড পরিবেশ বান্ধব পোশাককে সমর্থন করে

© levistrauss   © news.adidas

© levistrauss © news.adidas

লেভি, নাইকি, জারার মতো বিখ্যাত পোশাকের ব্র্যান্ডগুলি অনেক বছর ধরে পরিবেশ বান্ধব ধারণা প্রচার করছে। H অ্যান্ড M জৈব তুলা ব্যবহার করে এবং প্রাকৃতিক পশম ব্যবহার করে না। M অ্যান্ড S এমন কারখানা নির্মাণ করেছে যেখানে বিদ্যুত ও পানির প্রয়োজন কম হয়। জারা শুধুমাত্র পরিবেশ-বান্ধন পোশাকই বাজারে ছাড়ে না বরং সেইসাথে তাদের দোকানগুলোতে আলাদা আবর্জনার কন্টেনারগুলো রাখা থাকে।

লেভি হল প্রথম ব্র্যান্ড যারা ইকো-ডেনিম এবং নির্জল চিহ্নের জিন্স বাজারে ছেড়েছে, যার অর্থ কোম্পানি বিভিন্ন উৎপাদন পর্যায়ে পানি সংরক্ষণ করে তার প্রকাশ। অ্যাডিডাস সাগর থেকে সংগৃহীত আবর্জনা দিয়ে পরিবেশ-বান্ধব জুতো তৈরি করেছে। নাইকি ১৯৯৩ সাল থেকে রিউস-এ-জুতো প্রকল্পটি প্রচার করছে। টেনিস কোর্ট এবং টডমিল তৈরির জন্য জুতাগুলি পুনর্ব্যবহৃত করা হয়। বেশিরভাগ কোম্পানি এখন ২ বছরের মধ্যে জীবাণুবিয়োজ্য ব্যাগ ব্যবহার করছে।    

 

৫. বন নিরাময় ড্রোন

© youtube

© youtube

অরণ্যবিনাশ আমাদের গ্রহকে ধীরে ধীরে নষ্ট করছে। বিভিন্ন কোম্পানি এটি পুনরুদ্ধারের জন্য ‘গ্রহের ফুসফুস’ নামের কিছু উপায় খুঁজছে। বন পুনঃস্থাপন প্রচারে সবচেয়ে সফল প্রারম্ভ হল ড্রোনের ব্যবহার। এই ড্রোন সঠিক বীজ বাছাই করার জন্য পরিবেশ স্ক্যান করবে এবং পরে অতিরিক্ত ড্রোন সেগুলো রোপণ করবে।

রবিন নামের একটি ড্রোন আছে যেটি ১৮ মিনিটে ১ হেক্টর (১০৭,৬৩৯ বর্গ ফুট)এলাকা জুড়ে গাছ লাগাতে পারে এবং দিনের মধ্যে ১০০,০০০টি গাছের সংখ্যা গণনা করে। বায়োকার্বন ইঞ্জিনিয়ারিং নামে একটি ব্রিটিশ প্রকল্প ২০৫০ সালের মধ্যে ৫০০ বিলিয়ন গাছ চাষের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা বন সংরক্ষণে  মোকাবেলা করতে পারে।    

     

৬. বিশ্বের "সবুজ" রেস্টুরেন্ট

© museschool

© museschool

ক্যালিফোর্নিয়ার এমইউএসই স্কুলে ক্যাফেটেরিয়া সকল ইকো-ফ্রি রেস্টুরেন্টের মধ্যে চ্যাম্পিয়ন। এটি বিভিন্ন মানদণ্ড (যেমন তাদের মানের খাদ্য, মেনু, সম্পদ অর্থনীতি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ইত্যাদি) মধ্যে সর্বোচ্চ স্কোর আছে এবং ৪টি স্টার রয়েছে। চলচ্চিত্র পরিচালক জেমস ক্যামেরন এবং তার স্ত্রী সুসি এই রেস্টুরেন্টটি উপস্থাপন করেন, এখানে সূর্যমুখী আকৃতির সোলার ব্যাটারি দিয়ে রেস্টুরেন্টটি পরিচালিত হয়।

স্কুল তাদের নিজস্ব ফল ও সবজি চাষ করে এবং ১.৫ বছরের মধ্যে কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকি হ্রাস করার জন্য তারা তাদের অধিকাংশ খাবারে প্রতিস্থাপিত করেছে।

 

৭. পূর্বদিকে আবর্জনার টুকরা অপসারণ করা হচ্ছে

© Imagelon

© Imagelon

© Big Think

© Big Think

প্রশান্ত মহাসাগরে ১০০,০০০ টনেরও বেশি প্লাস্টিক রয়েছে। অনেক বিজ্ঞানী এটা পরিষ্কার করার জন্য বিভিন্ন মত প্রস্তাব করেছিলেন, কিন্তু ৬ বছর আগে "ইস্টার্ন আবর্জনা প্যাচ" কিভাবে সরিয়ে ফেলা যায় সেটির সর্বোত্তম পদ্ধতি প্রস্তাব করেন বয়ান স্ল্যাট। তার উন্নতির সাথে প্রকল্পটি ২০১৮ সালে শুরু করা হয়।  

পরিকল্পনাতে বিশাল ভাসমান বাধা ব্যবহার করে ৫ বছরের মধ্যে ৫০% আবর্জনা অপসারণ করা হবে। সংগৃহীত আবর্জনাগুলো চেয়ার, গাড়ির যন্ত্রাংশ এবং অন্যান্য জিনিস তৈরিতে ব্যবহার করা হবে। মহাসগর পরিষ্কারের ফাউন্ডেশনের অধিকাংশ বিনিয়োগকারীরা হলেন সিলিকন ভ্যালির ব্যবসায়ীরা।  

 

৮. ‘যে জুতা বড় করা যায়’ প্রকল্প

© theshoethatgrows

© theshoethatgrows

এক সময়ে, স্বেচ্ছাসেবক ক্যান্টন লি লক্ষ্য করেছিলেন যে, কেনিয়ার অনাথ ছেলেমেয়েরা তাদের পায়ের তুলনায় ছোট জুতাগুলো পরতো এবং অনেক শিশুরা আহত পা নিয়ে খালি পায়ে দৌড়ে বেড়াত। এই কারণে তিনি স্যান্ডেলের জন্য একটি আইডিয়া বের করেন যা একটি শিশুর সাথে একসাথে বড় হবে। একটি বিশেষ সরঞ্জাম ব্যবহার করে, ৫ পয়েন্ট দিয়ে জুতার আকার বড় করা যায় যা ৫-৬ বছর বয়সী শিশুদের জন্য ভাল হতে পারে।  

তিনি The Shoe That Grows প্রোজেক্টের জন্য একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেছেন যেখানে বিশ্বের যেকোন প্রান্ত থেকে যেকেউ শিশুদের জন্য জুতা কিনতে পারেন। অনেক লোক আছে যারা সাহায্য করতে চান।

  

৯. নেপোলিস স্মার্ট ইকোসিটি - ২১ শতকের একটি শহর

© neapolis

© neapolis

সাইপ্রাসে একটি ইকো-শহর রয়েছে, নাম হল নেপোলিস- ভূমধ্যসাগরে একটি অনন্য জায়গা। সেখানে বাস করার জন্য ঘর থাকবে, বিনোদন কেন্দ্র, শপিংমল, হাসপাতাল, একটি সবুজ এলাকা এবং সমুদ্রের দৃশ্য। এই স্মার্ট শহরটিতে, আপনি গবেষণা কেন্দ্র, বিশ্ববিদ্যালয় এবং আরও অনেক কিছুতে কাজ করতে ও শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারবেন। 

নেপোলিসের সমস্ত সরবরাহ ব্যবস্থা এআই দ্বারা সজ্জিত করা হবে যা পরিবেশ রক্ষা করতে সাহায্য করবে। প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে ২৫% শক্তি উৎপাদিত হবে। নেপোলিসের নতুন জীবনটি ২০২৩ সালের কাছাকাছি শুরু হবে।   

 

১০. ভারতবর্ষের মানুষেরা একদিনে ৫০ মিলিয়ন গাছ লাগিয়েছিল

© Rajesh Kumar Singh / National Geographic   © Thrive With Diabetes   © Rajesh Kumar Singh / National Geographic

© Rajesh Kumar Singh / National Geographic © Thrive With Diabetes © Rajesh Kumar Singh / National Geographic

২০১৬ সালে, ভারতে স্বেচ্ছাসেবীরা ২৪ ঘন্টায় ৮০টি বিভিন্ন ধরনের গাছ রোপণ করে। তারা সড়ক, রেলপথ, এবং জনসাধারণের জমিতে এই গাছগুলো লাগিয়েছিল। ভারত (অন্যান্য অনেক দেশের মত) গত কয়েক শতাব্দী ধরে বনের বিপুল ক্ষতির শিকার হয়েছিল, কারণ মানুষ তাদের আগুন ও অন্যান্য কাজে বন উজাড় করে দিয়েছে।   

এই মুহুর্তে, ১ দিনে অসংখ্য (৪৯.৩ মিলিয়ন) গাছ লাগানো বিশ্ব রেকর্ড ধরে আছে।

 

পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখবেন অবশ্যই। যেখানে সেখানে খাবারের প্যাকেট, পানির বোতল, প্লাস্টিক এবং সিগারেটের ফিল্টার ছুঁড়ে ফেলবেন না। আর বেশি করে গাছ লাগান পরিবেশ বাঁচান। 

আমাদের আয়োজন আপনাদের কেমন লেগেছে? ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট এবং শেয়ার করে আমাদের সাথেই থাকুন। সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ।  



জনপ্রিয়