ইতিহাসের ১০ টি রক্তক্ষয়ী ছাত্র সংগ্রাম।  ইতিহাসের ১০ টি রক্তক্ষয়ী ছাত্র সংগ্রাম।

ইতিহাসের ১০ টি রক্তক্ষয়ী ছাত্র সংগ্রাম।

কালে কালে ছাত্র সমাজ পৃথিবীর নানা প্রান্তে অত্যাচার অবিচারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। তারা বলিষ্ঠ কণ্ঠে প্রতিবাদ করে গেছে ক্ষমতাধর সব রাষ্ট্র নেতাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু এই জন্য তাদের অনেককে দিতে হয়েছে প্রান আর বয়ে গেছে রক্ত নদী।

আজ আপনাদের জানাবো স্মরণীয় কিছু রক্তক্ষয়ী ছাত্র সংগ্রামের ইতিহাস। যার নৃশংসতা ও নির্মমতা জেনে আপনি শিউরে উঠবেন।    

১। মে ১৯৬৮ সালের বিপ্লব, ফ্রান্স।

 

প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়া ও কিছু ছাত্রের বহিস্কারকে কেন্দ্র করে এই আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে। এর সাথে যুক্ত হয় বেকার সমস্যা ও পুরনো শিক্ষা পদ্ধতি। দেশটির কর্মক্ষম জনগণের প্রায় ২৮ শতাংশ এই আন্দোলনে অংশ নেয়। বহুদিন ধরে চলা ছাত্র পুলিশ সংঘর্ষে প্রায় শতাধিক আহত ও কয়েকজন নিহত হয়। এই আন্দোলনের ফলে ফ্রান্সের পুঁজিবাদী সরকার শিক্ষাব্যবস্থা উন্নয়নে ও শ্রমিকদের বেতন বাড়াতে বাধ্য হয়। 

২। জার্মান ছাত্র আন্দোলন, ১৯৬৮ সাল।

 

১৯৬৮ সালে বৈশ্বিক অস্থিরতা ছিল চরমে। পশ্চিম জার্মানিও নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছাত্রদের জায়গা দিতে পারছিল না তার সাথে বামপন্থীদের মধ্যে ভাঙন ধরে। বামপন্থী নৈরাজ্যবাদী নেতা রুডি অধিকাংশ শিক্ষার্থীদের মৌলবাদী সংগ্রামে প্ররোচিত করছিলেন। এর মধ্যেই তিনি গুলিবিদ্ধ হোন। পরে প্রায় ৫০ হাজার ছাত্র জনতা তার বিরুদ্ধে করা সংবাদ বিলি না করতে দেয়ার জন্য রাস্তা অবরোধ করে ফেলে। এতে ১৮০ জনকে গ্রেফতার করা হয়।

৩। ছাত্র অবরোধ আমেরিকা, ১৯৭০ সাল।

 

১৯৭০ সালে ওহিওর একদল শিক্ষার্থী কম্বোডিয়া আক্রমণের জন্য প্রেসিডেন্ট নিক্সনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। পুলিশ নিরস্ত্র ছাত্রদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে এতে ৪ জন ছাত্র মারা যায়। এই হত্যার বিরুদ্ধে সারা দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। প্রায় ৪৫০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায় এবং গৃহযুদ্ধের মত পরিস্থিতি তৈরি হয়।  

৪। চিলির ছাত্র আন্দোলন, ২০১১-১২ সাল।

 

২০১১ সালে নতুন শিক্ষা পদ্ধতির বিরুদ্ধে চিলির সাধারণ ছাত্ররা আন্দোলন শুরু করে। তাছাড়া শিক্ষা বাজেটে ঘাটতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অভাব অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। এতে প্রায় ২ লক্ষ্য শিক্ষার্থী অংশগ্রহন করে। এই আন্দোলন সংঘর্ষে ৫০০ পুলিশ আহত, ১৮০০ ছাত্র গ্রেফতার ও একজন মারা যায়।

৫। ইরানী ছাত্র আন্দোলন, ১৯৯৯ সাল।

 

‘সালাম’ পত্রিকা বন্ধের জন্য বহুদিন ধরে ইরানের তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন চালিয়ে আসছিল। একদিন মধ্যরাতের কিছু ঘণ্টা পরে পুলিশ অতর্কিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডরমিটরিতে হামলা চালায়। এতে এক শিক্ষার্থী ও এক অতিথি নিহত হয়। আহত হয় অনেক শিক্ষার্থী। এরপর আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক শিক্ষার্থীকে হেনস্থা করা হয় এবং আরো ৫ জন মারা যায়।  

৬। ইন্দোনেশিয়ার ত্রিশাক্তি হত্যা আন্দোলন, ১৯৯৮ সাল।

 

জাকার্তার ত্রিশাক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ শিক্ষার্থীকে পুলিশের গুলি করে হত্যা করার বিরুদ্ধে এই আন্দোলন শুরু হয়। এরপর প্রায় ৬ হাজার শিক্ষার্থী ও শিক্ষক রাস্তায় নেমে আসে। এতে প্রায় ১২০০ জন মারা যায় এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পদত্যাগে বাধ্য হয়।

৭। এথেন্স ছাত্র বিপ্লব, গ্রীস, ১৯৭৩ সাল।

 

জুন্তা মিলিটারি ও তাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন শুরু হয়। এথেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বেতার সম্প্রচারের মাধ্যমে দেশবাসীকে একত্র করতে সক্ষম হয়। কিন্তু মিলিটারিরা ট্যাঙ্কসহ বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা করে বসে। এতে ২৪ জন মারা যায় এবং সহস্রাধিক শিক্ষার্থী আটক করা হয়।

৮। থিয়ানানমেন চত্বর ছাত্র অবরোধ, চীন, ১৯৮৯ সাল।

 

এটা ইতিহাসের খুব আলোচিত ছাত্র বিক্ষোভ। এই আন্দোলনে প্রায় এক লক্ষ শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এবং পরবর্তীতে থিয়ানানমেন চত্বরে প্রায় পাঁচ লক্ষ জনসমাবেশ ঘটে। মিলিটারিরা ততোধিকবার জনসমাবেশে সশস্ত্র আক্রমণ করে। এতে নিহতের সংখ্যা প্রায় হাজার ছাড়িয়ে যায়।

৯। তালাতেলোলকো গণহত্যা, মেক্সিকো, ১৯৬৮ সাল।

 

রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বভৌমত্ব উদ্ধারে প্রায় দশ হাজার শিক্ষার্থী পথে নেমে আসে। তারা প্লাজা দে লাস এ জড়ো হতে থাকে ও শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ চালিয়ে যায়। কিন্তু আকাশে আতশবাজি ছোড়া হলে পুলিশ জনসমাবেশে গুলি ছোড়া শুরু করে। প্রায় ২০০-৩০০ জন ছাত্র ঘটনাস্থলে মারা যায়। দেড় হাজার জনকে গ্রেফতার করা হয়।

১০। সোয়েতো বিপ্লব, দক্ষিণ আফ্রিকা, ১৯৭৬ সাল।

 

শিক্ষাব্যবস্থায় স্থানীয় বানতু ভাষার পরিবর্তে ইংরেজি চালু করার বিরুদ্ধে এই আন্দোলন শুরু হয়। পরবর্তীতে সোয়েতো ছাত্র জোটের অধীনে আন্দোলন শুরু করতে হাজারে হাজারে মানুষ অরলান্ডো স্টেডিয়ামের দিকে অগ্রসর হয়। কিন্তু অকস্মাৎ পুলিশ তাদের উপর আক্রমণ করে এবং কুকুর লেলিয়ে দেয়। পরবর্তীতে প্রায় ১৮ হাজার পুলিশ সোয়াতো ঘিরে ফেলে। সরকারীভাবে মৃতের সংখ্যা ১৭৬ বলা হলেও তা প্রায় ৬০০ ছাড়িয়ে যায়। এই আন্দোলন বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনকে বেগবান করে।



জনপ্রিয়