ভারতের আসামের এক আজব স্কুল, যে স্কুলের বেতন টাকার পরিবর্তে প্লাস্টিক বর্জ্য!         ভারতের আসামের এক আজব স্কুল, যে স্কুলের বেতন টাকার পরিবর্তে প্লাস্টিক বর্জ্য!

ভারতের আসামের এক আজব স্কুল, যে স্কুলের বেতন টাকার পরিবর্তে প্লাস্টিক বর্জ্য!

বিশ্ব উষ্ণায়নের যুগে দূষণ রুখতে বিজ্ঞানীরা যখন হিমশিম খাচ্ছেন, তখন আসামের প্রত্যন্ত এলাকার একটি স্কুল প্লাস্টিক-দূষণ প্রতিরোধে নতুন দিশা দেখাচ্ছে। তাদের মিশন শুধু দূষণ প্রতিরোধ নয়, এই স্কুলের লক্ষ্য আরও অনেক। চলুন জেনে আসা যাক আজব এই স্কুল সম্পর্কে-

বছর তিনেক আগে, ২০১৬ সালে যাত্রা শুরু করা পামোহিতে গাছপালা ঘেরা 'অক্ষর' নামের এই স্কুলটি গুয়াহাটি থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। অক্ষরের পথ চলা যাদের হাত ধরে তারা হলেন পারমিতা শর্মা এবং মজিন মুখতার। তারা জানিয়েছেন - 'আমাদের স্বপ্ন ছিল এমন একটা স্কুল তৈরি করা যেখানে গতানুগতিক শিক্ষা নয়, শিক্ষার্থীদের নানা বিষয়ে উৎসাহী করে তোলা যাবে। আর প্রথম পদক্ষেপটাই ছিল প্লাস্টিক দূষণ রোধ করা।'

© Akshar Foundation / Facebook

© Akshar Foundation / Facebook

মজিন ও পারমিতা জানিয়েছেন - পামোহির অধিকাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে বসবাস করেন। যাদের পেশা হয় পাথর কাটা, না হয় রাজমিস্ত্রীর কাজ, চা শ্রমিকও আছেন অনেকেই। নুন আনতে পান্তা ফুরায় এমন সংসারে ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠানোটা তাদের কাছে এক প্রকার বিলাসিতা। তাই ছোট থেকেই এখানকার শিশুদের রুজিরোজগারে নেমে পড়তে হয়। অশিক্ষার সাথে সাথে অত্র অঞ্চলের শিশুদের সঙ্গী অপুষ্টি। এমন একটা স্থানে অত্যাধুনিক স্কুল তৈরির পরিকল্পনাটা প্রথমে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, পরে সার্থক হয়।

প্রেমের বন্ধন থেকেই স্কুলের পরিকল্পনা, 'অক্ষর' এক ভিন্ন গল্প বলে

নিউ ইয়র্কে জন্ম নেওয়া মজিন সেখানকার একটি স্কুলে কর্মরত ছিলেন। যে স্কুলের একটি প্রজেক্ট নিয়েই ভারতে এসেছিলেন তিনি। ওই প্রজেক্টেই কাজ করতে এসেই পামোহিতে টাটা ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সেস (TISS)-এ মাস্টার্স করা পারমিতার দেখা পান মজিন। 

পেশার স্বার্থে পরিচয় হলেও, অচিরেই একে অপরের প্রেমে পড়ে যান তারা। পারমিতাই মজিনের সামনে অসমের প্রত্যন্ত এলাকার মানুষদের দারিদ্রের ছবি তুলে ধরেন। বিদেশে ফিরে না গিয়ে বরং দেশের মাটিতেই দেশের মানুষজনের জন্য কাজ করার শপথ নেন এই জুটি। বিয়ের পর পরই শুরু করে দেন স্কুল তৈরির কাজ। আর তাদের স্বপ্নের স্কুলটির নাম দেন 'অক্ষর'। ছোট্ট স্কুলটি খুব চমৎকারভাবেই সাজিয়ে তোলেন দু'জনে।

© Akshar Foundation / Facebook

© Akshar Foundation / Facebook

পারমিতা জানান - স্কুল শুরু করার আগে অত্র অঞ্চলে পা রাখলেই পোড়া প্লাস্টিকের গন্ধে নাভিশ্বাস উঠতো। সারাদিনের ব্যবহার করা প্লাস্টিক পুড়িয়ে এই বিষ ধোঁয়া সৃষ্টি করতো এখানকার মানুষজনই। প্রাপ্তবয়স্কদের সাথে এই কাজে অংশ নিতো শিশুরাও। তিনি আরো জানান, প্লাস্টিক যে কতোটা বিষাক্ত, প্রাণহানির কারণ সেটা এলাকাবাসীকে বোঝাতেই অনেকদিন সময় লেগেছিল। সেই সাথে বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের স্কুলে ধরে আনার কাজও করতে হতো।

টাকা নয়, স্কুলের বেতন প্লাস্টিক বর্জ্য!

এই স্কুলে পড়তে আসে দিনমজুর, চা শ্রমিক থেকে শুরু করে অভাবী পরিবারের শিশুরা। শুরুতে সফলতার দেখা মেলেনি বলে জানান মজিন। ২০১৬ সালে যখন স্কুলের কার্যক্রম শুরু করেন সে সময় স্কুলের শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল মাত্র ১৫ জন। ২০১৯-এ এসে এই সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে। আশার কথা হলো, বর্তমানে আশপাশের এলাকা থেকেও বাচ্চাদের এই স্কুলে ভর্তি নিয়ে করাতে নিয়ে আসেন অভিভাবকরা। বেতন হিসেবে কানাকড়িও নেওয়া হয় না 'অক্ষর'-এ, বরং শিক্ষার্থীদের নির্দেশ দেওয়া টাকার পরিবর্তে নিজের বাড়ির বা এলাকার ব্যবহৃত বা অব্যবহৃত সব প্লাস্টিক স্কুলে জড়ো করতে।

© Akshar Foundation / Facebook

© Akshar Foundation / Facebook

ক্লাস হিসেবে প্লাস্টিকের পরিমাণও ঠিক করে দিয়েছেন পারমিতা-মজিন দম্পতি। সপ্তাহে কমপক্ষে পঁচিশটি প্লাস্টিকের যে কোনও সামগ্রী জমা করা বাধ্যতামূলক। পারমিতা বলেন, ‘'সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল এলাকার লোকজনকে রাজি করানো। দীর্ঘদিনের তাদের এই প্লাস্টিক ব্যবহার ও পোড়ানোর অভ্যাসটা বন্ধ করা রীতিমতো চ্যালেঞ্জিং ছিল আমাদের কাছে।

এছাড়াও, তাদের সন্তানদের স্কুলের পাঠ নিতে রাজি করানোটাও ছিল বেশ কঠিন। শুধুমাত্র পড়াশোনা করানোর জন্য স্কুলে নিজেদের সন্তানদের পাঠাতে রাজি ছিলেন না কোন অভিভাবক। তাই এই অভিনব বেতনের ভাবনা আসে আমাদের মাথায়।'

স্কুলে শিক্ষার্থীদের জমানো প্লাস্টিক থেকে ইকো-ব্রিক

© Akshar Foundation / Facebook

© Akshar Foundation / Facebook

নর্থ-ইস্ট এডুকেশন রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের অনুমতি নিয়ে স্কুলে সপ্তাহে যতো প্লাস্টিক জমা হয় সেগুলো দিয়ে ইকো-ব্রিক (Eco-Brick) তৈরি করা হয় আজব স্কুল অক্ষরে। প্রতি প্লাস্টিক বোতলের ভেতর ব্যাগ, অন্যান্য শুকনো প্লাস্টিকজাত সামগ্রী ঢুকিয়ে মুখ বন্ধ করে তৈরি করা হয় এই ইকো-ব্রিক বা PET Bottle। পরিবেশবান্ধব এই ইকো-ব্রিক বছরের পর বছর সংরক্ষণ উপযোগী, যেগুলো যেকোন নির্মাণ কাজে ইটের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়। যার ফলে ইট-ভাটার দূষণও রোধ করা সম্ভব বলে জানান মজিন।

কেমব্রিজ স্কুলের ছায়া পামোহির অক্ষরে

© Akshar Foundation / Facebook

© Akshar Foundation / Facebook

প্রথম দিকে মজিন ও পারমিতার একক প্রচেষ্টায় অক্ষরের কার্যক্রম শুরু হলেও, সময়ের সাথে সাথে অনেক শিক্ষক-শিক্ষিকাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এসেছেন এখানকার শিক্ষার্থীদের পড়াতে। এই স্কুলে ইংরেজি ও অঙ্ক শেখানো হয় কেমব্রিজ স্কুলের মতো করে। এখানকার দশম ও দ্বাদশের ছাত্রছাত্রীরা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ওপেন স্কুলিং (NIOS)’-এর তত্ত্বাবধানে বোর্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে।

ছাত্রছাত্রীদের স্বনির্ভর করে তোলার প্রচেষ্টা এই স্কুলের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য। ইকো-ব্রিক তৈরি করে স্কুলের বেশিরভাগ খরচের যোগান দেয় এখানকার শিক্ষার্থীরাই। এছাড়াও, হস্তশিল্পের জিনিসপত্র তৈরির পাশাপাশি, বিদ্যুৎ খরচ বাঁচাতে অক্ষরে রয়েছে সোলার প্যানেল। যার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন কোমলমতি শিক্ষার্থীরাই।

© Akshar Foundation / Facebook

© Akshar Foundation / Facebook

মজিন ও পারমিতা জানান - টাকা-পয়সার হিসেব রাখার পদ্ধতিও শেখানো হয় বাচ্চাদের, যার জন্য খেলনার টাকা দেওয়া হয় শিক্ষার্থীদের। ক্যাম্পাসের ভেতরেই দোকান থেকে হিসেব করে খাবার জিনিস, বই কেনে শিক্ষার্থীরা। পছন্দের স্যান্ডউইচ, চকোলেট সব কিনতে পারে ওই টাকা থেকেই। কোন কিছু ক্রয় করার পর, বাকি টাকা হিসেব করে তারা ফেরতও দেয় শিক্ষক-শিক্ষিকাদের।

প্রথাগত শিক্ষা নয়, এখানে হাতেকলমে শিক্ষা দেওয়া হয়। এখানে পরীক্ষার রেজাল্ট নম্বরের উপর নির্ভরশীল নয়। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, জ্ঞান, শেখার আগ্রহকে মাপকাঠি করে পুরোটাই মেধাভিত্তিক রেজাল্ট প্রদান করা হয়। প্রাণীদের প্রতিও দয়াবান হওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয় অভিনব স্কুল অক্ষরে। পথ কুকুরদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য স্কুলের নিজস্ব একটা অ্যানিমাল শেল্টারও রয়েছে।

© Akshar Foundation / Facebook

© Akshar Foundation / Facebook

অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও ২০১৮ সালে এই স্কুলের খরচ চালানোর দায়িত্ব নেয় অয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেড। বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী ও ভারত রত্ন ভুপেন হাজারিকার ছেলে তেজ হাজারিকা মজিন ও পারমিতাকে ডেকে পাঠিয়ে বিশেষ সম্মান দেন। এছাড়াও, জাতিসংঘ প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই বিশেষ স্কুল পরিচালনার জন্য প্রশংসা করে এই যুগলের। পাঠদানের ক্ষেত্রে দিল্লির পাঁচটি সরকারি স্কুল ‘অক্ষর’কে অনুকরণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মুম্বাইতেও এমন স্কুল তৈরি করতে এই দম্পতির সাহায্য চেয়েছে। মজিন ও পারমিতা দম্পতি নিজ দেশে সামনের পাঁচ বছরে এমন একশোটিরও বেশি স্কুল তৈরির স্বপ্ন দেখেন। শুভকামনা এই চমৎকার হৃদয়ের এই যুগলের জন্য।

আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না। সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ...



জনপ্রিয়