ছবিতে ছবিতে বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সোনালি দিনগুলো ! ছবিতে ছবিতে বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সোনালি দিনগুলো !

ছবিতে ছবিতে বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সোনালি দিনগুলো !

বাংলা সাহিত্যের এক অবিস্মরণীয় প্রতিভা। তাঁর মতো এরকম দুহাত উজাড় করে বাংলা সাহিত্যকে এতো রত্নভাণ্ডার আর কোন সাহিত্যিক উপহার দিতে পারেননি। ঊনিশ শতকের এক দুর্বল সাহিত্যের অধিকারী বাংলাকে তিনি প্রায় একক প্রচেষ্টাতেই উজ্জীবিত করেছেন, সমৃদ্ধ করে তুলেছেন। বিশ্বসভায় বাংলা সাহিত্যকে সগৌরবে উচ্চ আসনে বসিয়েছেন। নিরন্তর সৃষ্টি করেছেন তিনি।

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যুবক বয়সের ছবি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যুবক বয়সের ছবি।

তাঁর মত এরকম ঐকান্তিক একাগ্রতায় সারা জীবনব্যাপী শুধুমাত্র সাহিত্য সৃষ্টি আর কোনো সাহিত্যিকের দ্বারা সম্ভবপর হয় নি। না এই অঞ্চলে, না সারা বিশ্বে। স্বচ্ছল পরিবারে জন্ম হওয়ার কারণে জীবিকা নিয়ে তাঁকে তেমন করে ভাবতে হয় নি কখনো। ফলে, আমৃত্যু তিনি সার্বক্ষণিক সাহিত্য সৃষ্টির জন্য অফুরাণ সময় পেয়েছেন। 

 

১৯১৭: 'ডাকঘর' নাটকে ফকিরের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং

১৯১৭: 'ডাকঘর' নাটকে ফকিরের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং

আর সেই সুযোগকে পূর্ণভাবে তিনি কাজে লাগিয়েছেন তাঁর অবিরাম আগ্রহ, নিরলস প্রচেষ্টা এবং ক্লান্তিহীন লেখালেখির মাধ্যমে। রবীন্দ্রনাথ নিজেই ঈর্ষণীয় রকমের দীর্ঘায়ু ছিলেন। এই দীর্ঘ জীবনে তিনি অসংখ্য সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টির পরিমাণের দিক দিয়ে বাংলা সাহিত্যে তাঁর ধারে কাছেও কেউ নেই। তাঁর সমতুল্য সৃষ্টি বিশ্বের অন্য কোনো সাহিত্যে আর কেউ করেছে কি না বিষয়েও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

 

১৮৮১: 'বাল্মীকি-প্রতিভা' য় অভিনেতা-অভিনেত্রী রবীন্দ্রনাথ ও ইন্দিরা দেবী

১৮৮১: 'বাল্মীকি-প্রতিভা' য় অভিনেতা-অভিনেত্রী রবীন্দ্রনাথ ও ইন্দিরা দেবী

১৮৮১: 'বাল্মীকি-প্রতিভা' য় অভিনেতা-অভিনেত্রী রবীন্দ্রনাথ ও ইন্দিরা দেবী

 

১৮৮৩: স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ

১৮৮৩: স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ

১৮৮৩: স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ

এই বিপুল সৃষ্টিতে, যেখানে কবি সাহিত্যিকদের বেশিরভাগেরই প্রতিষ্ঠা আসে জীবনের প্রথম চল্লিশ বছরের মধ্যে, তারপর তাঁদের জীবনে মোটামুটি বন্ধ্যাত্ব নেমে আসে, সেখানে রবীন্দ্রনাথ আমৃত্যু লিখে গিয়েছেন অকাতর।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং তার বড় মেয়ে মাধুরীলতা ও মেঝো মেয়ে রেণুকা। (ছবি -১৮৯০) 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং তার বড় মেয়ে মাধুরীলতা ও মেঝো মেয়ে রেণুকা। (ছবি -১৮৯০) 

শুধু লিখে গিয়েছেন বললে ভুল হবে, উৎকর্ষের দিক দিয়ে এই শেষের বছরগুলো বরং ছাড়িয়ে গিয়েছে আগের রবীন্দ্রনাথকে। ওয়ার্ডসওয়ার্থ, টেনিসন, ব্রাউনিং কেউই চল্লিশ পরবর্তী জীবনে আগের রচনার তুলনায় উৎকৃষ্টতর কবিতা লেখেন নি- তাদের কবিকীর্তি চল্লিশ বৎসরের আগে রচিত কাব্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। একমাত্র রবীন্দ্রনাথ ও হুগো শেষ জীবনে যা লিখেছিলেন তাহ আগের জীবনে যালিখেছিলেন তার সমানতো বটেই, কোনো কোনো রচনার ক্ষেত্রে বরং আরও উচ্চতর।

 

নিজের সন্তান এবং পুত্রবধূর সাথে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি দূর্লভ ছবি। ছবিতে বাঁ দিক থেকে ডান দিকে বসে আছেন- কন্যা মীরা, পুত্র রথীন্দ্রনাথ, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ, পুত্রবধূ প্রতিমা এবং কন্যা বেলা। 

নিজের সন্তান এবং পুত্রবধূর সাথে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি দূর্লভ ছবি। ছবিতে বাঁ দিক থেকে ডান দিকে বসে আছেন- কন্যা মীরা, পুত্র রথীন্দ্রনাথ, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ, পুত্রবধূ প্রতিমা এবং কন্যা বেলা। 

নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির আগের রবীন্দ্রনাথের লেখা প্রাজ্ঞ হয়ে উঠেছে নোবেল প্রাপ্তির পরের সময়ে। নোবেল পুরস্কারের মান রক্ষার খাতিরেই রবীন্দ্রনাথকে বৈশ্বিক ও বিশ্বমানবিক চিন্তা-চেতনার অনুশীলন করতে হয়েছে। তাঁর দীর্ঘায়ু তাঁকে এ সুযোগ-সৌভাগ্য দিয়েছে। পুরস্কার প্রাপ্তির পরে তিনি সুদীর্ঘ ২৮ বছর বেঁচে ছিলেন, তার আগে বাল্য-কৈশোরের যৌবনের মধ্যবয়সের কাঁচা-পাকা লেখায় ঊনিশ শতক ও বিংশ শতকের এক দশক কেটেছে তার।

 

১৯৩১: লন্ডনে এক ভোজসভায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

১৯৩১: লন্ডনে এক ভোজসভায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

প্রায় সমসংখ্যক বছরব্যাপী, কিন্তু পরিচ্ছন্ন ও পরিপক্ক জ্ঞান-প্রজ্ঞা, মন-মনন এবং মনীষা ও নৈপুণ্য নিয়ে বিশ্ববোধ অন্তরে জাগ্রত রেখে লিখেছেন জীবনের স্বর্ণযুগে আটাশ বছর ধরে। অর্থাৎ, পুরস্কারপ্রাপ্তি পূর্বকালের রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ঊনিশ শতকের কবি আর পুরস্কার উত্তরকালের রবীন্দ্রনাথ হলেন বিশ শতকের মনীষী মানুষ।

জাপান মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তৎকালীন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মাঝে রবীন্দ্রনাথ।

জাপান মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তৎকালীন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মাঝে রবীন্দ্রনাথ।

 

১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাবার পর রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠেছিলেন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব। ইংরেজি ভাষায় তাঁর জীবনী রচনার কাজ শুরু হয়েছিল ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকেই। সে-সব জীবনী ইংরেজি-ভাষী লেখকেরা লিখেছিলেন, আবার বাঙালি লেখকেরা এবং অ-বাঙালি ভারতীয় লেখকেরাও লিখেছিলেন। কিন্তু ইংরেজি ছাড়া অপর ইউরোপীয় ভাষাগুলিতে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে জীবনী রচনা কারা করেছিলেন? পাওয়া যায় চেকভাষায় রচিত একটি রবীন্দ্রজীবনীগ্রন্থ ! 

চেক গবেষক ভি. লেসনি ও রবীন্দ্রনাথ

চেক গবেষক ভি. লেসনি ও রবীন্দ্রনাথ

 

শান্তিনিকেতনের হাসপাতালের রোগীদের সংগে রবীন্দ্রনাথ।

 

শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের আতিথেয়তায় মহাত্মা গান্ধী ও তাঁর পত্নী কস্তুরবা গান্ধী, ১৯৪০

পশ্চিমবঙ্গের বোলপুরে ১৮৬৩ ষালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাবা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘শান্তিনিকেতন’ নামে একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন৷ ১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথ সেখানে একটি স্কুল চালু করেন, যা পরে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ নেয়৷ বছরের কিছু বিশেষ দিনে, যেমন বসন্ত উৎসব, খ্রীষ্ট উৎসব, পৌষ মেলার সময়ে, দেশ-বিদেশের পর্যটকেরা সেখানে যান কবিগুরুর বিকল্প শিক্ষাচিন্তার পাশাপাশি রাবিন্দ্রিক পরিবেশে সময় কাটাতে৷

 

সত্যজিতের ১০ বছর বয়স তখন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর প্রথম দেখা

সত্যজিতের ১০ বছর বয়স তখন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর প্রথম দেখা

রবীন্দ্রনাথের বয়স যখন ৭০ বছর এবং সত্যজিতের ১০ বছর বয়স তখন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর প্রথম দেখা হয় শান্তিনিকেতনের পৌষমেলায়। বালক সত্যজিতের বয়স যখন ১০, তখন পৌষমেলা দেখার জন্য শান্তিনিকেতন গিয়েছিলেন। সঙ্গে ছিলেন মা সুপ্রভা রায়। নতুন অটোগ্রাফের খাতা কেনা হয়েছে। ছোট্ট সত্যজিতের ভীষণ শখ, প্রথম আটোগ্রাফটা নেবেন রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে।

 

বার্ধক্যে রবীন্দ্রনাথ

বার্ধক্যে রবীন্দ্রনাথ

 

১৯৩৯: পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুরে মহিলাদের দেওয়া সংবর্ধনায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ

 

মহাজাতি সদনের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন উপলক্ষে ভাষণ দিচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পাশে রয়েছেন সুভাষচন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র বসু এবং অন্যান্যরা।

 

বড় দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ

 

কলেজ স্ট্রিটে, পুরসভার কমার্শিয়াল মিউজিয়ামের এক প্রদর্শনীতে। সঙ্গী প্রশান্তচন্দ্র মহালনবীশ, অনিলকুমার চন্দ প্রমুখের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

বিদ্যাসাগর স্মৃতি ভবনের দ্বারোদ্ঘাটনে যদুনাথ সরকার, সজনীকান্ত দাস, জেলাশাসকের স্ত্রী মিসেস বি আর সেনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ

 

চলার পথে সঙ্গী ক্ষিতিমোহন সেন, সাগরময় ঘোষ প্রমুখের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ

 

চিত্রাঙ্গদা’র কলাকুশলীদের সঙ্গে দিল্লিতে রবীন্দ্রনাথ

 

শান্তিনিকেতনে পড়ুয়াদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ

 

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গী ত্রিপুরার মহারাজা রাধাকিশোর মাণিক্য

 

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে রবীন্দ্রনাথ

 

জোড়াসাঁকোয় বিশ্ব ভারতী সম্মিলনীতে রবীন্দ্রনাথ। সঙ্গে সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী

 

আইনস্টাইনের সঙ্গে, ১৯৩০

 

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং জলধর সেনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ

 

জীবনের শেষ চার বছর ছিল তাঁর ধারাবাহিক শারীরিক অসুস্থতার সময়। এই সময়ের মধ্যে দুইবার অত্যন্ত অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী থাকতে হয়েছিল তাঁকে। ১৯৩৭ সালে একবার অচৈতন্য হয়ে গিয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থা হয়েছিল কবির। সেবার সেরে উঠলেও ১৯৪০ সালে অসুস্থ হওয়ার পর আর তিনি সেরে উঠতে পারেননি। এই সময়পর্বে রচিত রবীন্দ্রনাথের কবিতাগুলি ছিল মৃত্যুচেতনাকে কেন্দ্র করে সৃজিত কিছু অবিস্মরণীয় পংক্তিমালা। মৃত্যুর সাত দিন আগে পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টিশীল ছিলেন। দীর্ঘ রোগভোগের পর ১৯৪১ সালে জোড়াসাঁকোর বাসভবনেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হাসপাতালে যাওয়ার পথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। জীবিত অবস্থায় এটাই তার শেষ ছবি। 

হাসপাতালে যাওয়ার পথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। জীবিত অবস্থায় এটাই তার শেষ ছবি। 

রবীন্দ্রনাথ নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠ বাঙালিদের মধ্যে অগ্রগণ্য। তাঁর অসীম মেধা, সীমাহীন সৃষ্টিশীলতা, শিল্প-সাহিত্যের বিভিন্ন অঙ্গনে সাবলীল বিচরণ অন্য সব বাঙালিদের থেকে তাঁকে অনন্য করে তুলেছে।



জনপ্রিয়