স্মৃতি-বিস্মৃতির শহর ঢাকার নামকরণের ইতিহাস ও ঐতিহাসিক ছবিগুলো হৃদয়ের গভীরে নাড়া দিবে   স্মৃতি-বিস্মৃতির শহর ঢাকার নামকরণের ইতিহাস ও ঐতিহাসিক ছবিগুলো হৃদয়ের গভীরে নাড়া দিবে

স্মৃতি-বিস্মৃতির শহর ঢাকার নামকরণের ইতিহাস ও ঐতিহাসিক ছবিগুলো হৃদয়ের গভীরে নাড়া দিবে

ঢাকা শুধু বাংলাদেশের রাজধানী শহরই নয়, সামাজিক-সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক বিভিন্ন দিক থেকে ঢাকা বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্র। এর রয়েছে প্রায় চারশ’ বছরের পুরনো ইতিহাস! প্রাচীন ঢাকার রয়েছে হরেক রকম এলাকা-মহল্লা, অলি-গলি-তস্য গলি। সাথে রয়েছে তাদের বাহারি সব নাম।

আচ্ছা, জায়গাটার নাম ফার্মগেট কেন? এখানে কি এককালে মুরগীর ফার্ম ছিল? কাকরাইল, পিলখানা, তোপখানা, টিকাটুলি, সুক্কাটুলি- এসব অদ্ভুত নামেরই বা কি অর্থ! ধানমন্ডিতে কি এককালে প্রচুর ধানক্ষেত ছিল? পানিটোলায় কি ছিল? এলিফ্যানট রোডে কি এককালে এলিফ্যানট মানে হাতিরা ঘুরে বেড়াত? আর স্বামীবাগে বুঝি স্ত্রী হারা স্বামীরা বাস করতেন? এখন আমাদের কাছে মজার মনে হলেও, আসলে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার নাম সুপ্রাচীন ঢাকারই ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সযত্নে বহন করে চলছে। স্মৃতি-বিস্মৃতির শহর ঢাকার নামকরণের ইতিহাস ও ঐতিহাসিক ছবিগুলো দেখে মনে হবে সময় কত তাড়াতাড়ি চলে যায় এবং এক সময় আমরাও হয়ে যাব ইতিহাস,  আজ জেনে নেই ঢাকার কিছু এলাকার নামকরনের ইতিহাস, নিচে দেওয়া সবগুলো নমকরনের এলাকা এবং ছবি একই যায়গার নয় 

 

চকবাজার

১৮৮৫ সালে তোলা ঢাকার চকবাজারের দৃশ্য এটি।

১৮৮৫ সালে তোলা ঢাকার চকবাজারের দৃশ্য এটি।

যেই জায়গা থেকে আমরা দারুণ সব কাবাব ও রমজানের সময় স্বুস্বাদু সব ইফতারি কিনে থাকি সেখানে একসময় ক্রীতদাস ক্রয়-বিক্রয় করা হত। ১৮০৯ সালে চার্লস ডেল চকবাজার সম্পরকিত বর্ণনায় বলেছেন- ‘চক’ ‘Nakhas’ দ্বারা পরিচিত। এটি ২০০ ফুটের একটি বর্গক্ষেত্র এলাকা যা সূর্যাস্তের সময় জমজমাট হয়ে ওঠে। আরবিতে ‘Nakhas’ অর্থ হচ্ছে ‘দাস বিক্রেতা’। মোঘল আমলে এটি ছিল দাস ব্যবসায় এবং লোকজনের আড্ডার কেন্দ্রবিন্দু।  চক দ্বারা পরিচালিত ছিল বলে এর নাম ছিল চকবাজার। 
 

ইন্দিরা রোড

ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী

ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী

বেশীর ভাগ মানুষের ধারণা ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নামে নামকরণ করা হয়েছে রাস্তাটির। আসলে তা নয়। এককালে এ এলাকায় দ্বিজদাস বাবু নামে এক বিত্তশালী ব্যক্তি বসবাস করতেন। তার ছিল বিশাল বাড়ি। বাড়ির কাছের এই রাস্তাটি তার বড় মেয়ে ইন্দিরার নামে নামকরণ করা হয় ইন্দিরা রোড। 

 

পিলখানা

১৮৭২ সালে তোলা ঢাকার একটি রাস্তার ছবি। রাস্তাটি শনাক্ত করা যায় নি।

১৮৭২ সালে তোলা ঢাকার একটি রাস্তার ছবি। রাস্তাটি শনাক্ত করা যায় নি।

ইংরেজ শাসনামলে যাতায়াত, মালামাল পরিবহন ও যুদ্ধের কাজে প্রচুর হাতি ব্যবহার করা হত। বন্য হাতিকে পোষ মানানো হত যেসব জায়গায় তাকে বলা হত পিলখানা। সে সময় ঢাকায় একটি বড় সরকারি পিলখানা ছিল। সরকারি কাজের বাইরেও ধনাঢ্য ঢাকাবাসীরা নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি দিয়ে তাদের হাতিগুলোকে এখানে পোষ মানানোর জন্য পাঠাতে পারতেন। 

 

এলিফ্যানট রোড

রমনা গেট এর ১৯০১ সালে তোলা ছবি। যেখানটায় এখন দোয়েল চত্বর অবস্থিত।

রমনা গেট এর ১৯০১ সালে তোলা ছবি। যেখানটায় এখন দোয়েল চত্বর অবস্থিত।

শুনতে অবাক লাগলেও, এককালে আমাদের এই আধুনিক নগরী ঢাকায় প্রচুর হাতির আনাগোনা ছিল। তবে তাদের মাঠে চরা বা গোসল করার জন্য কোন নির্দিষ্ট জায়গা ছিল না। ১৮৬৪ সালে দুই কাউন্সিল গঠনের পূর্বে লেফটেন্যান্ট গভর্নর ঢাকা দর্শন করতে আসেন। ঢাকা কমিটির সদস্যদের অভিযোগ অনুযায়ী সেসময় হাতির পাল ঢাকায় ভয়ানক উপদ্রব করে। রমনা এলাকাটি হাতির চরণ এবং এর আশেপাশের খালগুলো গোসল এর জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল। পিলখানা থেকে রমনা পর্যন্ত হাতিদের চলার পথটি কালের বিবর্তনে এলিফ্যান্ট রোড নামে পরচিতি লাভ করে।

 

কাকরাইল

মধুমিতা সিনেমা হল

মধুমিতা সিনেমা হল

ঊনিশ শতকের শেষ দশকে ঢাকার কমিশনার ছিলেন মিঃ ককরেল। সম্ভবত তার নামে সে এলাকায় কোন রাস্তা ছিল। সে সময় ইংরেজ কমিশনারদের নামে রাস্তার নামকরণ করার রেওয়াজ ছিলো। সেই ককরেল রোড থেকে কালক্রমে এলাকার নাম হয়ে যায় কাকরাইল।

 

কাগজীটোলা

ঢাকার গন পরিবহন , ১৯৬৫

ঢাকার গন পরিবহন , ১৯৬৫

ইংরেজ শাসনামলে ঢাকায় কাগজ তৈরি করা হত। যারা কাগজ তৈরি করতেন তাদের বলা হত ‘কাগজী’। কাগজীরা যে এলাকায় বাস করতেন আর যেখানে কাগজ উৎপাদন ও বিক্রি করতেন সে এলাকাই কাগজীটোলা নামে পরিচিতি লাভ করে। 

 

গোপীবাগ

১৯০৪ সালে তোলা ঢাকেশ্বরী মন্দিরের দৃশ্য

১৯০৪ সালে তোলা ঢাকেশ্বরী মন্দিরের দৃশ্য

গোপীনাগ নামক এক ধনী ব্যবসায়ী এই এলাকার মালিক ছিলেন। তিনি স্থাপন করেছিলেন ‘গোপীনাথ জিউর মন্দির’। তখন থেকেই এই এলাকার নাম গোপীবাগ। 

 

চাঁদনী ঘাট

সদর ঘাট - ১৯৬০

সদর ঘাট - ১৯৬০

সুবাদার ইসলাম খাঁর একটা বিলাশবহুল প্রমোদতরী ছিল। প্রমোদতরীর নাম ছিল – চাঁদনী। ‘চাঁদনী’ ঘাটে বাধা থাকত। অন্য কোন নৌকা এই ঘাটে আসতে পারত না। সেখান থেকে এলাকার নাম চাঁদনী ঘাট। 

 

টিকাটুলি

শের-এ-বাংলা এ কে ফজলুল হক তার নিজ বাসবভনে , টিকাটুলি , ঢাকা । (১৯৫৪) ; ছবি - Life Magazine

শের-এ-বাংলা এ কে ফজলুল হক তার নিজ বাসবভনে , টিকাটুলি , ঢাকা । (১৯৫৪) ; ছবি - Life Magazine

 এক সময় হুক্কা টানার বেশ চল ছিল বাংলা মুল্লুকে। আর ঢাকার এই এলাকা ছিল হুক্কার ‘টিকা’ তৈরির জন্য বিখ্যাত। ‘টিকা’ তৈরিকারকরা এই এলাকায় বাস করতেন ও ব্যবসা করতেন। 

 

তোপখানা

তোপখানা রোড, ১৯৬৫

তোপখানা রোড, ১৯৬৫

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর গোলন্দাজ বাহিনীর অবস্থান ছিল এখানে।

 

পুরানা পল্টন, নয়া পল্টন

 ১৮৭৫ সালে ধারন করা পুরানা পল্টনের চিত্র।

১৮৭৫ সালে ধারন করা পুরানা পল্টনের চিত্র।

এ এলাকা ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর ঢাকাস্থ সেনানিবাস। 

 

ধানমন্ডি  

ধানমন্ডি 12/A ,ঢাকা - ১৯৬৭

ধানমন্ডি 12/A ,ঢাকা - ১৯৬৭

মোঘল শাসনামলে এখানে একটি ঈদগাহ ষাট গম্বুজ মসজিদ ছিল। তাই ধরে নেয়া যায় যে এখানে কিছু বাসস্থানও ছিল। এখানে একটি বিশাল হাঁট বসত যেখানে চাল ও হরেক রকমের শস্য কেনাবেচা হত। সেখান থেকেই ‘ধানমন্ডি’ নামের উৎপত্তি।

 

পরীবাগ

মিটফোর্ড হাসপাতালের ১৯০৪ সালে ধারন করা ছবি ।  এই স্থানে এখন সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ অবস্থিত

মিটফোর্ড হাসপাতালের ১৯০৪ সালে ধারন করা ছবি ।  এই স্থানে এখন সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ অবস্থিত

 পরীবানু নামে নবাব আহসানউল্লাহর এক মেয়ে ছিল। সম্ভবত পরীবানুর নামে এখানে একটি বড় বাগান করেছিলেন আহসানউল্লাহ।

 

পাগলাপুল

১৮৭২ সালে তোলা লালবাগ কেল্লা'র ছবি

১৮৭২ সালে তোলা লালবাগ কেল্লা'র ছবি

১৭ শতকে এখানে একটি নদী ছিল, নাম – পাগলা। মীর জুমলা নদীর উপর সুন্দর একটি পুল তৈরি করেছিলেন। অনেকেই সেই দৃষ্টিনন্দন পুল দেখতে আসত। সেখান থেকেই জায়গার নাম পাগলাপুল। 

 

পানিটোলা

 ১৮৮০ সালে তোলা বুড়িগঙ্গা নদীর দৃশ্য এটি

১৮৮০ সালে তোলা বুড়িগঙ্গা নদীর দৃশ্য এটি

যারা টিন-ফয়েল তৈরি করতেন তাদের বলা হত পান্নিঅলা। পান্নিঅলারা যেখানে বাস করতেন সে এলাকাকে বলা হত পান্নিটোলা। পান্নিটোলা থেকে পানিটোলা। 

 

ফার্মগেট

ফার্মগেট ফুটওভার ব্রিজ (পিছনে হলিক্রস কলেজ ) , ১৯৯২  ছবিঃ মাহমুদ রহমান

ফার্মগেট ফুটওভার ব্রিজ (পিছনে হলিক্রস কলেজ ) , ১৯৯২ ছবিঃ মাহমুদ রহমান

 কৃষি উন্নয়ন, কৃষি ও পশুপালন গবেষণার জন্য বৃটিশ সরকার এখানে একটি ফার্ম বা খামার তৈরি করেছিল। সেই ফার্মের প্রধান ফটক বা গেট থেকে এলাকার নাম ফার্মগেট। 

 

শ্যামলী

১৮৭২ সালে তোলা ঢাকার সেন্ট থমাস চার্চের দৃশ্য

১৮৭২ সালে তোলা ঢাকার সেন্ট থমাস চার্চের দৃশ্য

১৯৫৭ সালে সমাজকর্মী আব্দুল গণি হায়দারসহ বেশ কিছু ব্যক্তি এ এলাকায় বাড়ি করেন। এখানে যেহেতু প্রচুর গাছপালা ছিল তাই সবাই মিলে আলোচনা করে এলাকার নাম দেন শ্যামলী। 

 

সূত্রাপুর

১৮৭৫ সালে তোলা নারিন্দা খ্রিস্টান কবরস্থানের ছবি

১৮৭৫ সালে তোলা নারিন্দা খ্রিস্টান কবরস্থানের ছবি

কাঠের কাজ যারা করতেন তাদের বলা হত সূত্রধর। এ এলাকায় এককালে অনেক শূত্রধর পরিবারের বসবাস ছিলো।

 

সুক্কাটুলি

 ১৮৭২ সালে তোলা ঢাকা কলেজের পুরানো ক্যাম্পাসের দৃশ্য

১৮৭২ সালে তোলা ঢাকা কলেজের পুরানো ক্যাম্পাসের দৃশ্য

১৮৭৮ সালে ঢাকায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু হয়। এর আগে কিছু লোক টাকার বিনিময়ে চামড়ার ব্যাগে করে শহরের বাসায় বাসায় বিশুদ্ধ খাবার পানি পৌঁছে দিতেন। এ পেশাজীবিদেরকে বলা হত ‘ভিস্তি’ বা ‘সুক্কা’। ভিস্তি বা সুক্কারা যে এলাকায় বাস করতেন সেটাই কালক্রমে সিক্কাটুলি নামে পরিচিত হয়। 

 

স্বামীবাগ

রোজ গার্ডেন, স্বামীবাগ,  ১৯৬৭

রোজ গার্ডেন, স্বামীবাগ, ১৯৬৭

ত্রিপুরালিংগ স্বামী নামে এক ধনী এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী এক ব্যক্তি এ এলাকায় বাস করতেন। তিনি সবার কাছে স্বামীজি নামে পরিচিত ছিলেন। তার নামেই এলাকার নাম হয় স্বামীবাগ। 

 

মালিবাগ

 ১৯০৪ সালে তোলা চকবাজার মোড়ের দৃশ্য। যার পাশে এখন গড়ে উঠেছে শেখ বোরহান উদ্দিন কলেজ। বর্তমানে এটি নিজাম উদ্দিন রোড নামে পরিচিত

১৯০৪ সালে তোলা চকবাজার মোড়ের দৃশ্য। যার পাশে এখন গড়ে উঠেছে শেখ বোরহান উদ্দিন কলেজ। বর্তমানে এটি নিজাম উদ্দিন রোড নামে পরিচিত

ঢাকা একসময় ছিল বাগানের শহর। বাগানের মালিদের ছিল দারুণ কদর। বাড়িতে বাড়িতে তো বাগান ছিলই, বিত্তশালীরা এমনিতেও সৌন্দর্য্য পিপাসু হয়ে বিশাল বিশাল সব ফুলের বাগান করতেন। ঢাকার বিভিন্ন জায়গার নামের শেষে ‘বাগ’ শব্দ সেই চিহ্ন বহন করে। সে সময় মালিরা তাদের পরিবার নিয়ে যে এলাকায় বাস করতেন সেটাই আজকের মালিবাগ।

 

মিন্টো রোড

মিন্টো রোড, ঢাকা । ১৯৬৪

মিন্টো রোড, ঢাকা । ১৯৬৪

শাহবাগের মিন্টো রোড এর নাম রাখা হয়েছে লর্ড মিন্টোর নামে। মিন্টো ১৯০৫ থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর জেনারেল ও ভাইসরয় ছিলেন।

 

কোন ছবিটি আপনার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে আমাদের কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না। আপনার আশে পাশের যে কোন ভালো কিংবা মজার ছবি যদি আমাদের মাধ্যমে পেইজে অথবা আর্টিকেলে শেয়ার করতে চান তাহলে আমাদের ফাঁপরবাজ পেইজের ইনবক্সে ছবিটি কোথায় উঠানো এবং কে উঠিয়েছেন এই তথ্য সহ মূল ছবিটি পাঠাতে পারেন, পরবর্তিতে আমরা আপনার তোলা ছবি সবার সাথে শেয়ার করব। সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ

 

তথ্যসূত্রঃ ঢাকাঃ স্মৃতি-বিস্মৃতির শহর – মুনতাসীর মামুন , ইন্টারনেট



জনপ্রিয়