প্লাস্টিকের তৈরি দূষণের ফলে প্রাণী জগৎ এবং সম্পূর্ণ বাস্তুসংস্থান ধ্বংস হচ্ছে... প্লাস্টিকের তৈরি দূষণের ফলে প্রাণী জগৎ এবং সম্পূর্ণ বাস্তুসংস্থান ধ্বংস হচ্ছে...

প্লাস্টিকের শক্তির কাছে কি আমরা ও আমাদের প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র অসহায়?

আমি প্লাস্টিকের দূষণ সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরার আগে আপনি আপনার চারপাশে একটু তাকান। এটা হতে পারে আপনার মোবাইল ফোনের কেস, যে কাপ নিতে আপনি চা পান করেন, কিংবা যেটাতে আপনার দুপুরের খাদ্য আসে সেই পাত্রটি প্রায় সবকিছুই প্লাস্টিক থেকেই তৈরি। আমরা প্লাস্টিকের তৈরি পণ্য এত বেশি ব্যবহার করে যে তারা সত্যি বলতে গেলে আমাদের একটা অবিচ্ছেদ্য উপাদানে পরিণত হয়েছে। পরিবেশগত স্বাস্থ্য খবর অনুযায়ী প্লাস্টিকে ব্যবহৃত কেমিক্যাল গুলো মানব শরীরে বিভিন্ন উপায়ে প্রবেশ করে।

মাটির নিচে যে সকল প্লাস্টিক পুঁতে ফেলা হয় সেগুলো থেকে ক্ষতিকর কেমিক্যাল নির্গত হয় ভূপৃষ্ঠের নিচের বিশুদ্ধ পানিতে যুক্ত হতে পারে। যেহেতু আমরা প্রচুর পরিমাণে প্লাস্টিক উৎপাদন করি যার জন্য আমরা কিংবা আমাদের পরিবেশ ধীরে ধীরে এই প্লাস্টিক ধ্বংস করছে। প্লাস্টিকের তৈরি দূষণের ফলে প্রাণী জগৎ এবং সম্পূর্ণ বাস্তুসংস্থান ধ্বংস হচ্ছে। আমাকে বিশ্বাস করতে বলছি না আপনি প্লাস্টিক দূষণ সংক্রান্ত এই তথ্যগুলো খুব মনোযোগ সহকারে পড়ুন। আপনি নির্ধারন করুন আমরা কি আর ও প্লাস্টিক ব্যবহার করবো নাকি আজ থেকেই এর ব্যবহার বন্ধ করব?

১. প্লাস্টিকের উৎপাদন মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে

Source:oceanconservancy.org

Source:oceanconservancy.org

গবেষণায় দেখা যায় যে ১৯৫০ সালে যেখানে প্লাস্টিকের উৎপাদন ছিল ২ মিলিয়ন টন সেটা ২০১৫ সালে বেড়ে ৩৮০ মিলিয়ন টনে দাঁড়িয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, প্লাস্টিকের উৎপাদনের পরিমাণ ৩,৪০০ কোটি টনে উন্নীত হবে। ভেবে দেখেছেন আমাদের পরিবেশ কিংবা সভ্যতা কতটা বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে?

২. জার্মানি সবচাইতে বেশি প্লাস্টিক রিসাইকেল করে

www.plasticsnews.com

www.plasticsnews.com

যে সকল দেশে প্লাস্টিকের তৈরি পণ্যের ব্যবহার অনেক বেশি তাদের তালিকা অনুযায়ী সবার শীর্ষে অবস্থান করছে জার্মানি যারা প্রতি বছর তাদের সামগ্রিক প্লাস্টিক বর্জ্যের ৫৬% রিসাইকেল করে অন্যদিকে অস্ট্রিয়া দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছে যারা ৫৩% প্লাস্টিকের বর্জ্য রিসাইকেল করে। পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়া ৫৩% প্লাস্টিক বর্জ্য রিসাইকেল করে। এই তালিকায় দশটি শীর্ষ দেশের মধ্যে আমেরিকা ও অন্যতম।

৩. প্লাস্টিকের তৈরি দূষণের বিরুদ্ধে আমেরিকায় ১৯৮৮ সালের ৩১ শে ডিসেম্বর প্রতিবাদ শুরু হয়

www.conserve-energy-future.com

www.conserve-energy-future.com

মারপল এন এক্স ফাইভ নামে একটি আন্তর্জাতিক সম্মতি চুক্তি যেকোনো ধরনের প্লাস্টিকের তৈরি বর্জ্যকে সামুদ্রিক পরিবেশ অপসারণে নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

৪. প্লাস্টিকের ৪৬% পৃথিবীর সমুদ্রগুলোতে ভাসে

Internet

Internet

আমাদের সমুদ্রের প্রায় অর্ধেকের বেশি অংশ জুড়ে প্লাস্টিকের বর্জ্য সমুদ্রপৃষ্ঠে ভাসছে। কে জানে কতটুকু প্লাস্টিক ইতিমধ্যে সমুদ্রের তলদেশের গভীরে ডুবে সেখানকার ইকো সিস্টেমকে নষ্ট করছে?

৫. প্লাস্টিকের তৈরি কাপ গুলোরই পুরোপুরি পচে যেতে ৫০-৮০ বছর সময় লাগে

www.conserve-energy-future.com

www.conserve-energy-future.com

বিভিন্ন খাবারের দোকানে কিংবা কফি শপে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের তৈরি কাপ গুলোই ব্যবহার করা হয়। সেগুলো সেখান থেকে ময়লার ঝুড়িতে যায় এবং পরিশেষে সমুদ্রে গিয়ে এদের অবসান হয়। সুতরাং আমাদের উচিত এগুলো বর্জন করা।

৬. রিসাইকেলিং এর সাহায্যে শক্তি বেশি সংরক্ষণ করা যায়

www.conserve-energy-future.com

www.conserve-energy-future.com

প্লাস্টিককে চুল্লির মধ্যে পোড়াতে যে পরিমান শক্তি খরচ হয় তার চেয়ে কম খরচে প্লাস্টিক রিসাইকেল করা যায়।

৭. প্রতিবছর ১,০০,০০০ সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী প্লাস্টিকের দূষণে মারা যায়

scontent.fdac7-1.fna.fbcdn.net

scontent.fdac7-1.fna.fbcdn.net

সমুদ্রপৃষ্ঠে কিংবা ভূমিতে প্লাস্টিকের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অংশগুলো প্রাণীরা খাদ্য মনে করে খেয়ে ফেলে। যার দরুন প্রতি বছর হাজার হাজার প্রাণী প্লাস্টিক দূষণে মৃত্যু বরণ করে।

৮. প্রতিদিন পৃথিবী জুড়ে ৫০০ মিলিয়নের বেশি প্লাস্টিকের তৈরি ব্যবহার হয়ে থাকে

www.5gyres.org

www.5gyres.org

বিশ্ব জুড়ে বিভিন্ন ধরনের ফাস্টফুড কিংবা অন্যান্য খাবারের দোকানে স্ট্র বহুলভাবে ব্যবহার করা হয়। এবং অস্ত্রগুলোর অধিকাংশই মিশে যাচ্ছে আমাদের সমুদ্রে।

৯. শুধু মাত্র চারটি উপায় প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনা সম্ভব

oceanconservancy.org

oceanconservancy.org

প্লাস্টিককে রিসাইকেল করা যেতে পারে, জ্বালানি তে রূপান্তর করা যেতে পারে, ধ্বংস করা যেতে পারে অথবা প্রাকৃতিক পরিবেশে উন্মুক্ত অবস্থায় ফেলে দেয়া যেতে পারে। এদের মধ্যে সর্বোত্তম ভালো উপায় হচ্ছে প্লাস্টিক কে রিসাইকেল করা অথবা জ্বালানিতে রূপান্তর করা।

১০. পৃথিবীর উৎপন্ন প্লাস্টিক এর  অর্ধেকই এশিয়াতে উৎপন্ন হয়

im.indiatimes.in

im.indiatimes.in

চীন, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইন সমুদ্রে ৬০% প্লাস্টিক দূষণের জন্য দায়ী। সবচাইতে বেশি পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরীর জন্য দায়ী যথাক্রমে চীন, ইন্দোনেশিয়া এবং ভিয়েতনাম।  

১১. প্লাস্টিকের মোট উৎপাদনের শতকরা ৪০ ভাগ শুধুমাত্র মোড়কীকরণের জন্য উৎপাদন করা হয়

news.nationalgeographic.com

news.nationalgeographic.com

মোড়কীকরণ হচ্ছে আরেকটি একবার ব্যবহারযোগ্য উপাদান যা আমরা দ্বিতীয় ব্যবহার করিনা। দ্বিতীয় বেশি সংখ্যক প্লাস্টিক উৎপাদন করা হয় নির্মাণ সংক্রান্ত কাজের জন্য। তৃতীয় সর্ববৃহৎ প্লাস্টিক উৎপাদন করা হয় বস্ত্র শিল্পের জন্য।

১২. বোতলজাত পানি তৈরি করতে বোতলের পানির চেয়ে বেশি পরিমাণ পানি অপচয় করা হয়

plasticoceans.org

plasticoceans.org

যদিও বিষয়টা শুনে আপনার মিথ্যা মনে হতে পারে কিন্তু এটাই সত্য। প্রতি বোতল পানি উৎপাদন করতে বোতলের পানির চেয়ে ৬ গুণ বেশি পানি অপচয় করা হয়।

১৩. ১৪% প্লাস্টিক বর্জ্য পানীয় জাতীয় পণ্যের পাত্র থেকে আসে

plasticoceans.org

plasticoceans.org

এক্ষেত্রে আমরা এ সকল পাত্রের একক ব্যবহার কমিয়ে প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ কমাতে পারে।

১৪. শুধুমাত্র আমেরিকানরা প্রতিবছর ১০০ বিলিয়ন প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার করে

www.earthday.org

www.earthday.org

যেখানে অন্যান্য দেশগুলো ইতিমধ্যে প্লাস্টিকের ব্যাগকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেছে, আমেরিকানরা এখন ও প্রতিদিন অগণিত প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার করছে। অথচ প্লাস্টিক বিরোধী আন্দোলন তাদের হাত ধরেই শুরু হয়েছিল। যুক্তরাজ্যে লোকজন তাদের নিজস্ব পুনঃব্যবহারযোগ্য ব্যাগ ব্যবহার করে থাকেন যখন তারা মলে কোন ধরনের মোদি সামগ্রী ক্রয় করতে যান। উৎপাদনকারীরা খুব সহজেই তাদের উৎপাদন কমিয়ে আনবে যদি আমরা আমাদের প্রতিদিনের কাজকর্মের প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে আনি।

১৫. প্লাস্টিকের রাসায়নিক উপাদান গুলো আপনার ওজন বাড়াতে সাহায্য করে

ehp.niehs.nih.gov

ehp.niehs.nih.gov

BPA ও BADGE নামে দুটি রাসায়নিক উপাদান প্লাস্টিক উৎপাদনের সময় ব্যবহার করা হয়। যদিও এরা স্থূলতার মূল কারণ নয় তবে এটা জানা গেছে যে এদের ফলে আমাদের শরীরের ওজন বাড়তে পারে।

১৬. আমাদের পানযোগ্য পানিতে প্লাস্টিক এর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা মিশ্রিত থাকে

www.earthday.org

www.earthday.org

প্লাস্টিকের বর্জ্যের এই কণাগুলো এত বেশি ক্ষুদ্র যা অতি সহজেই বিভিন্ন ধরনের পানি শোধনকারী যন্ত্রগুলোর ফাঁকফোকর দিয়ে বিশুদ্ধ পানিতে প্রবেশ করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে কলের পানির ৮৩% এ প্লাস্টিক এর বর্জ্যের এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপাদানে মিশ্রিত।

১৭. সামুদ্রিক জীবন্ত প্রবাল গুলো প্রতিনিয়তই মৃত্যুবরণ করছে

www.qm.qld.gov.au

www.qm.qld.gov.au

সমুদ্র অবস্থিত প্রবাল প্রাচীর গুলো পৃথিবীর সবচাইতে বৃহত্তম উৎপাদনশীল ইকোসিস্টেমগুলোর মধ্যে অন্যতম। অসংখ্য সামুদ্রিক প্রাণীদের আবাসস্থল হচ্ছে এই প্রবাল প্রাচীর। পাশাপাশি তারা উপকূলীয় অঞ্চল গুলো কে ঢেউয়ের প্রবাহ থেকে উৎপন্ন ক্ষতি থেকে বাঁচায় পাশাপাশি তারা ক্রান্তীয় যে কোন ঝড় থেকেও আমাদের রক্ষা করে। কার্বন এবং নাইট্রোজেন এর মাত্রা ঠিক রাখতে এদের অবদান অসীম। ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীর ৯০% এর বেশি প্রবালের মৃত্যু ঘটবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর পেছনে যারা দায়ী তাদের মধ্যে প্লাস্টিকের তৈরি এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া অন্যতম।

১৮. প্লাস্টিক আমাদের বন্য প্রানীদের হত্যা করছে

cdn.cnn.com

cdn.cnn.com

প্লাস্টিকের একটা বিশাল অংশ আমাদের সমুদ্রকে গ্রাস করছে। প্লাস্টিক খেয়ে ফেলার কারণে সামুদ্রিক পাখি, কচ্ছপ, মাছ, উদ বিড়াল এ সকল প্রাণীকে হয় বিপন্ন অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে কিংবা মৃত অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে। এটা আমাদের পৃথিবীর জন্য মোটেও সুখকর নয়। ৪০% সমুদ্রপৃষ্ঠ প্লাস্টিকের বর্জ্যে আচ্ছাদিত হয়ে পড়েছে। 

চলুন আমরা আজ থেকেই প্লাস্টিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে সচেতন হই এবং নিজ থেকে প্লাস্টিকের ব্যবহার কে না বলি। আমাদের সবুজ পৃথিবী কে প্লাস্টিকের হাত থেকে রক্ষা করি। শেয়ার করে সকলের কাছে পৌঁছে দিন  এই বার্তা.... 



জনপ্রিয়