রোমানরা কি জানত যে, যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ করার কারণে তারা ইতিহাসে চিরস্থায়ী জায়গা করে নেবেন? রোমানরা কি জানত যে, যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ করার কারণে তারা ইতিহাসে চিরস্থায়ী জায়গা করে নেবেন?

ক্রুশবিদ্ধকরণের সাথে সম্পর্কিত ভয়ানক এই সত্য ঘটনাগুলো জেনে অবাক হবেন!

Wikipedia

Wikipedia

ক্রূসিফিকেশন অথবা ক্রুশবিদ্ধকরণ বিতর্কিতভাবে সবচাইতে নিষ্ঠুর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের একটি প্রাচীন পদ্ধতি। রোমানরা তাদের প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ক্রুশবিদ্ধকরন পদ্ধতি শিখেছিল যা তাঁরা ব্যবহার করত তাদের নিয়ন্ত্রিত রাজ্যসমূহে।। মূলত প্রজাদের শাস্তি দেয়ার উদ্দেশ্যে এবং বিদ্রোহ অনুৎসাহিত করতে এই কঠিন শাস্তির অনুশীলন করা হতো। রোমানরা কি জানত যে, যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ করার কারণে তারা ইতিহাসে চিরস্থায়ী জায়গা করে নেবেন।

০৭. পার্সিয়াতে ক্রুশবিদ্ধকরন- বিদ্রোহ না থামালে তোমাদের ৩,০০০ উচ্চপদস্থ লোককে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করা হবে

Photo credit: livius.org, thecrucifixions.blogspot.com

Photo credit: livius.org, thecrucifixions.blogspot.com

অনেক প্রাচীন শাসকগণ ক্রুশবিদ্ধকরণের মাধ্যমে তাঁদের প্রজাদের কাছে এই বার্তা পাঠাতেন যেন যারা এ ধরনের কোনো কর্মকাণ্ডে না জড়ায় যাতে তাদের এই ভয়ানক শাস্তি পেতে হয়। পার্সিয়ান রাজা দারিউস ১ম এর আমলে (৫২২-৪৮৬ খ্রিষ্টপূর্ব) ব্যাবিলন শহরে রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা হয় ৫২২-৫২১ খ্রিস্ট পূর্বের দিকে। দারিয়ুস ব্যাবিলন পুনঃদখলের জন্য সামরিক অভিযান চালায় এবং ব্যাবিলন শহরে অবরোধ আরোপ করে। প্রজারা শহর এবং এর প্রতিরোধ ব্যবস্থা লন্ডভন্ড করার আগে ব্যাবিলনের দেয়াল এবং প্রবেশদ্বারগুলো ১৯ মাস ধরে কড়া নিরাপত্তায় বন্ধ রাখা হয়েছিল। পুনরায় শহরটা ব্যাবিলনীয়দের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। কিন্তু দারিয়ুস সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে বিদ্রোহীদের কাছে বার্তা পাঠাবে তাদেরকে ভয় দেখানোর জন্য। বার্তায় লেখা থাকবে বিদ্রোহ কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না এবং ৩,০০০ উচ্চপদস্থ ব্যাবিলনিয়দের ক্রুশবিদ্ধ করে মেরে ফেলা হবে। 

০৬. গ্রিসে ক্রুশবিদ্ধকরণ

Photo credit: warfarehistorynetwork.com

Photo credit: warfarehistorynetwork.com

৩২২ খ্রিস্টপূর্বে আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট টায়ারের ফিনিশিয়ান শহরের দখল নিয়ে নেন যেটা পার্শিয়ানরা নৌঘাটি হিসেবে ব্যবহার করতেন। এটা জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত চলমান একটা লম্বা সামরিক অবরোধের পর দখল করা সম্ভব হয়েছিল।আলেকজান্ডারের সৈন্যসামন্ত যখন টায়ারের আর্মিদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা গুরিয়ে দিল তখন টায়ারের আর্মিরা পরাজয় বরণ করল। একটা প্রাচীন উৎস থেকে জানা যায় সেই দিনে ৬,০০০ মানুষ মেরে ফেলা হয়েছিল। গ্রীক উৎসের ওপর ভিত্তি করে, রোমান লেখক ডায়োডোরাস এবং কুইন্টাস প্রতিবেদন করেছিল যে, আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট ২,০০০ মিলিটারি সৈন্যদের সৈকতে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যার আদেশ দিয়েছিলেন।

০৬. রোমে ক্রুশবিদ্ধকরণ

Photo credit: zainabslounge.blogspot.com

Photo credit: zainabslounge.blogspot.com

ক্রুশবিদ্ধ করণ রোমান আইন অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের প্রধান পদ্ধতি ছিল না। শুধুমাত্র বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে এই পদ্ধতি প্রযোজ্য ছিল। দাসেরা শুধুমাত্র তখন ক্রুশবিদ্ধ হতে পারে যখন তারা ডাকাতি কিংবা বিদ্রোহ করবে। রোমান নাগরিকদের ক্রুশবিদ্ধ করা হতো শুধুমাত্র বড় কোন রাষ্ট্রদ্রোহীতায় জড়িত থাকার অপরাধে।

০৫. স্পার্টাকাস এর বিদ্রোহ

Photo credit: Fyodor Andreyevich Bronnikov

Photo credit: Fyodor Andreyevich Bronnikov

৭৩ খ্রিষ্টপূর্বে স্পার্টাকাস নামের একজন রোমান দাস রোমান অধ্যুষিত কেপুয়া নামক স্থানের একটি গ্লাডিয়েটর ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে ৭৮ জন দাস সঙ্গীদের নিয়ে পালিয়ে যান। স্পার্টাকাস এবং তার সঙ্গীরা মিলে রোমান সমাজের অবিচার এবং সম্পদের অধিকারের অসমতাকে পুঁজি করে হাজার হাজার অন্য দাস এবং নিঃস্ব ও দলিত প্রজাদের নিয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এবং এর ফলশ্রুতিতে তিনি সৈন্য বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন যারা রোমের সৈন্য বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রায় দুই বছর বীরের মতো লড়াই করেছেন। রোমান সেনাবাহিনীর জেনারেল ক্রেসাস এই বিদ্রোহের অবসান ঘটান। এবং রোমান ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গণ ক্রুশবিদ্ধকরনের ঘটনা ঘটে। স্পার্টাকাস কে হত্যা করা হয় এবং তার সঙ্গীরা পরাজয় বরণ করেন। ৬,০০০ এর ও বেশি দাস বিদ্রোহী যারা বেঁচে গিয়েছিল তাদের রোম এবং কেপুয়ার মধ্যে অবস্থিত আপ্পিয়া নামের রাস্তার পাশে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়।

০৪. ইহুদীদের সংস্কৃতিতে ক্রুশবিদ্ধকরণ 

Photo credit: Willem Swidde

Photo credit: Willem Swidde

যদিও ইহুদীদের শাস্তির বিধান স্বরূপ ক্রুশবিদ্ধকরনের রীতি সরাসরি হিব্রু বাইবেলে উল্লেখ করা হয়নি। তবে বাইবেলের পঞ্চম গ্রন্থ ডিটোরনমির ২১.২২-২৩ এ বলা হয়েছে, " যদি কোন মানুষ মৃত্যুদন্ডে দণ্ডিত হওয়ার মত অপরাধ করে , তাকে মৃত্যুদণ্ড দাও, তাকে গাছে ঝুলিয়ে দাও, তার শরীর অবশ্যই সারারাত গাছে থাকবে না, কোনভাবে তাকে সেদিন কবর দেবে না।" ইহুদিদের ইতিহাস অনুযায়ী যথেষ্ট সংখ্যক ক্রুশবিদ্ধ করনের ঘটনার তথ্য রয়েছে। যার মধ্যে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল রাজা জুদায়া আলেকজান্ডার জেন্নাসের (১২৬-৭৬ খ্রিস্টপূর্ব) আদেশে ৮০০ ইহুদী রাজনৈতিক শত্রুকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করা। এই ঘটনা প্রাচীন ইহুদী লেখক জোসেফাস তাঁর লিখিত আন্টিকুইটিস বইয়ে উল্লেখ করেন।

০৩. ক্রুশবিদ্ধকরণে পেরেকের অবস্থান

Photo credit: askgramps.org

Photo credit: askgramps.org

পেরেক এর অবস্থান বিভিন্ন চিত্রশিল্পী এবং ভাস্করদের শিল্পকর্মে উপস্থাপিত যিশুখ্রিস্টের ক্রুশবিদ্ধকরনের ছবি বা ভাস্কর্য থেকে আমরা মূলত দেখতে পাই ক্রুশবিদ্ধকরনের সময় হাতের তালুতে পেরেক গাঁথা হয়। কিন্তু এখন আমরা জানতে পেরেছি যে হাতের তালুতে পেরেক গাঁথা হলে সেটা পুরো শরীরের ওজন ধরে রাখতে পারে না এবং আঙ্গুল ছিড়ে শরীর নিচে পড়ে যাওয়ার কথা। সুতরাং যাকে ক্রুশবিদ্ধ করা হচ্ছে তাঁর শরীরের ওপরের অংশ আড়াআড়িভাবে T এর মত দেখতে কাদের সাথে দড়ি দিয়ে বাঁধলেই কেবল শরীরের ভার ঠিক রাখা যায়। এবং সবচাইতে ভালো উপায় হচ্ছে হাতের কব্জির কিছুটা উপরে আলনা এবং রেডিয়াস নামের হাড়ের ভিতর দিয়ে পেরেক বিদ্ধ করা। সেক্ষেত্রে দড়ি দিয়ে না বাঁধলেও শরীরের ভার বহন করানো সহজ। কিন্তু কব্জিতে পেরেক বিদ্ধ করাটা পবিত্র গ্রন্থ গসপেল লেখা যীশুর ক্রুশবিদ্ধ করনের পদ্ধতি এর বিপরীতার্থক।  

০২. রোমান ক্রুশবিদ্ধকরণ পদ্ধতি

Photo credit: Newsweek

Photo credit: Newsweek

ক্রুশবিদ্ধকরণ এর কোনো আদর্শ পদ্ধতি ছিল না। রোমানদের প্রচলিত পদ্ধতি ছিল দণ্ডপ্রাপ্ত কে প্রথম ধাপে বেত দিয়ে প্রহার করা। পুঁথিগত উৎস থেকে এটাই জানা যায় যে, আসামিকে পুরো ক্রস বহন করতে হত না। তাকে শুধুমাত্র ক্রুশবিদ্ধ কারণে জায়গা পর্যন্ত ক্রসবিম বহন করতে হতো। যেখানে আগে থেকেই মাটিতে শুল গাঁথা থাকত যেটা একাধিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য ব্যবহার করা হতো। আসামিকে সেখানে নিয়ে যাওয়ার পর তার বাঁধন খুলে পেরেক এবং শক্ত দড়ি দিয়ে ক্রসবিমে আটকানো হত। এরপর T এর মত ক্রসবিমটিকে দড়ি দিয়ে উপরের দিকে উঠাতে টানা হত। যতক্ষণ না অভিযুক্তের পা মাটি থেকে উপরে উঠছে ততক্ষণে কাজটি করা হতো। অনেক সময় পাগুলো কেও কাঠের সাথে বাধা হত এবং পেরেক মারা হত। যদি আসামি বেশিক্ষণ অত্যাচার সহ্য করতে পারতো এবং মৃত্যু না হতো সেক্ষেত্রে মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য তাঁর পা ভেঙে দেয়া হতো।

০১. মৃত্যুর কারণ

The Gospel Herald

The Gospel Herald

অনেক ক্ষেত্রে ক্রুশবিদ্ধকরনের আগে চাবুক আঘাতেই আসামির মৃত্যু হয়, বিশেষ করে যখন চাবুকের সাথে ধারালো হাড়ের টুকরা কিংবা সীসা আটকানো হয়। যদি ক্রুশবিদ্ধকরণ কোন গরমের দিনে করা হয় সে ক্ষেত্রে শরীর থেকে ঘামের সাথে গুরুত্বপূর্ণ তরল পদার্থের নিঃসরণ ঘটে পাশাপাশি চাবুক আঘাতের ফলে রক্তক্ষরণে যে আঘাত তৈরি হয় সে আঘাতের কারণে দণ্ডপ্রাপ্ত হাইপোভোলেমিক শক থেকে মৃত্যু হতে পারে। অন্যদিকে শীতের কোনদিন দণ্ড কার্যকর করা হলে অভিযুক্তের হাইপোথারমিয়া হয়ে মৃত্যু হতে পারে। ক্রুশবিদ্ধকরণে মৃত্যুর মূল কারণ পেরেক বিদ্ধ করার ফলে রক্তক্ষরণ কিংবা শারীরিক আঘাত নয়। বরং যে পদ্ধতিতে ক্রুশবিদ্ধ করে অপরাধীকে রাখা হয় সে পদ্ধতির কারণে তার মৃত্যু হয়। আস্তে আস্তে তার পেশীগুলো অকার্যকর হয়ে মারাত্নক শ্বাসকষ্ট তৈরি হয় এবং পরিশেষে শরীরের সকল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে মৃত্যু ঘটে।আমাদের আয়োজন ভালো লাগলে লাইক, কমেন্ট ও বেশি বেশি শেয়ার দিয়ে সাথেই থাকুন।



জনপ্রিয়