মানুষ বাঁ-হাতি হয় কেন, বাঁ-হাতি হলে কী হয়? মানুষ বাঁ-হাতি হয় কেন, বাঁ-হাতি হলে কী হয়?

মানুষ বাঁ-হাতি হয় কেন, বাঁ-হাতি হলে কী হয়?

খেয়াল করলে দেখবেন আমাদের চেনা-জানা কিছু মানুষ বাম হাতে লিখেন। বাম হাতে কাজ করতে পছন্দ করে্ন। তারা 'বাঁ-হাতি' হিসেবে পরিচিত। অনেকে বাম হাতে লেখাকে বা কাজ করাতে অপছন্দ করে। তারপরও তারা বাম হাত দিয়ে কাজ করেন। কিন্তু কেন তারা বাঁ-হাতি হয়? আসুন আজ ফাঁপরবাজের মাধ্যমে জেনে নিই-

বারাক ওবামা

বারাক ওবামা

গবেষকদের মতে, বিশ্বে ৯-২০ শতাংশ মানুষ বাঁ-হাতি। ইউরোপের ১৭টি দেশের মানুষের লেখার অভ্যাস পর্যবেক্ষণ করে এ গবেষণার মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়, সারা বিশ্বে ২.৫ থেকে ১২.৮ শতাংশের মতো মানুষ বাঁ হাতে লেখেন। আরেক গবেষণায় প্রকাশ করা হয়েছে, সাধারণত বাঁ-হাতির সংখ্যা পুরুষদের মধ্যে বেশি।

ক্রিস গেইল

ক্রিস গেইল

একসময় সারা পৃথিবীতেই বাঁ-হাতিদের দুর্ভাগা ও বিদ্বেষপরায়ণ ভাবা হতো। আদিম কাল থেকেই বাঁ-হাতিরা বিশ্বব্যাপী নানা রকমের সামাজিক অপবাদ ও বৈষম্যের শিকার হয়েছে। ইউরোপিয়ান ভাষাও এ জন্য অনেকটা দায়ী। যেমন রাইট (Right) শব্দের অর্থ ঠিক এবং ডান। শুধু এই যুক্তিতে প্রাচীন ইউরোপে বাঁ-হাতিদের অবহেলা করা হতো।

আমির খান

আমির খান

প্রাচীন মিসরে বাঁ-হাতিরা কখনোই পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করতে পারতেন না। ভারতীয় উপমহাদেশেও বাঁ-হাতিদের নিয়ে নানা ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা ছিল। লাতিন রাজদরবারে ব্যবহৃত শব্দ ‘sinister’-এর অর্থ হলো বাম। আর এটিকে বিবেচনা করা হতো দুর্ভাগ্য বয়ে আনার প্রতীক হিসেবে।

গবেষকরা বাঁ-হাতি হওয়ার কারণ হিসেবে ৪০টির মতো জীনকে শনাক্ত করেছেন। এক গবেষণায় জানা যায়, জন্মগ্রহণের সময় শতকরা ৭৫ ভাগ শিশুই বামহাতি হওয়ার বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মায়। কিন্তু, পরবর্তী সময়ে পরিবেশ ও জীবনযাপন পদ্ধতি মিলিয়ে শিশু ডানহাতিতে পরিণত হয়।

বিশ্বখ্যাত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরবৃত্তীয় বিভাগের প্রধান ড. টিম ক্রোর মতে, সম্ভবত মানবদেহের পিসিডিএইচ-১১এক্স জিন হাতের ব্যবহারের এ বিষয়টি নির্ধারণ করে দেয়। অক্সফোর্ডের আরেক বিশেষজ্ঞ ড. ফ্রাংকসের মতে, ক্রোমোজোম ২-এর মধ্যে থাকা এলআরআরটিএম-১ জিনের জন্য মানুষ হাত ব্যবহারে আলাদা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হয়। এ ছাড়া মাতৃগর্ভে থাকা ডাই ইথাইল স্টিলবোস্টেরলের সংস্পর্শ বাঁ-হাতি হতে সহায়ক।

সৌরভ গাঙ্গুলি

সৌরভ গাঙ্গুলি

শুধু মানুষই নয়, অনেক পশু-পাখিও বাঁ-হাতি বৈশিষ্ট্য হয়। এক গবেষণায় বলা হয়, অস্ট্রেলিয়ান ক্যাঙ্গারুরা সব বাঁ-হাতি। সেখানে বলা হয়, দ্বিপদী প্রাণীর ক্ষেত্রে হয়তো এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু চতুষ্পদী প্রাণীরা এ ধরনের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে না।

প্রাণীর এই বিশেষ বিষয়টি নিয়ে টিয়া পাখি ও মুরগির ওপর গবেষণা করেছেন নরওয়ের ব্রুনে ক্যাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. লেসলি রজারস। তিনি জানান, চোখ ও হাতের সংযোগের কারণে প্রাণীরা শরীরের বিভিন্ন অংশকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করে। যেমন, যদি কোনো টিয়া পাখি ডান চোখে কোনো খাবার খেয়াল করে, তবে স্বভাবতই সে তা ধরতে ডান পা এগিয়ে দেবে। এই বৈশিষ্ট্যের জন্য রজারস মস্তিষ্কের ‘হেমিস্ফিয়ার’ অংশের কার্যপ্রণালির কথা তুলে ধরেন। মস্তিষ্কের এই অংশ ডান ও বামের বিষয়টি নির্ধারণ করে। কাজেই এই অংশটি স্বাভাবিকভাবেই বাঁ-হাতি বা ডানহাতি হিসেবে মানুষকে তৈরি করে।

সাকিব আল হাসান

সাকিব আল হাসান

গবেষণায় দেখা গেছে, বাঁ-হাতিদের ডান পাশের মস্তিষ্ক বেশি ব্যবহৃত হয়। এ জন্যই সাধারণত বাঁ-হাতিরা বেশি উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন হয়ে থাকে। বাঁ-হাতিদের জীবনের সাফল্য, প্রাপ্তি বা কৃতিত্বপূর্ণ কাজ ডানহাতিদের তুলনায় ঈর্ষণীয়। বলা হয়ে থাকে, তাঁদের আইকিউ বেশি এবং সংগীত ও গণিতে তাঁদের পারদর্শিতা ডানহাতিদের চেয়ে ভালো।

বাঁ-হাতিদের সম্পর্কে অজানা কিছু তথ্যঃ

ক্রীড়াজগতে ক্রিকেট, টেবিল টেনিস, ব্যাডমিন্টন, টেনিস, বেসবল খেলায় বাঁ-হাতিরা বেশ সুবিধা আদায় করে নিতে পারে। 

ইউরোপ ও আমেরিকা মহাদেশের সফল রাজনীতিবিদদের অনেকেই বাঁ-হাতি ছিলেন। বারাক ওবামা সহ আমেরিকান প্রেসিডেন্টদের মধ্যে চারজন বাঁহাতি ছিলেন। বলিউড পারফেক্টশনিস্ট খ্যাত আমির খানও একজন বাঁ-হাতি।

আমেরিকান প্রেসিডেন্ট

আমেরিকান প্রেসিডেন্ট

যুক্তরাষ্ট্রের লাফায়েত কলেজ এবং জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, বাঁ-হাতিরা ডানহাতিদের চেয়ে ১০-১৫% বেশি আয় করতে পারেন।

২৪ সপ্তাহের আগে এবং জন্মগত ওজন ১.৫ কেজির কম হলে সন্তান বাঁ-হাতি হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

অনিদ্রা, তোতলামির সমস্যা, অ্যালার্জি এবং মাথাব্যথার বা মাইগ্রেনের সমস্যায় ডানহাতিদের তুলনায় বাঁ-হাতিরা বেশি ভোগেন।

পিতা-মাতা উভয়ই যদি বাঁ-হাতি হন সেক্ষেত্রে শতকরা ২৬ জন শিশু বাঁ-হাতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

অধিকাংশ যন্ত্র এবং সরঞ্জাম ডানহাতিদের উপযোগী করে বানানোর ফলে, প্রতিবছর বিশ্বে দুই হাজারের বেশি বাঁ-হাতি বিভিন্ন দুর্ঘটনার শিকার হন।

বাঁ-হাতিদের জীবনকাল ডানহাতিদের চেয়ে কম হয়, এমনটিই বলা হয়েছিল ১৯৮৯ ও ১৯৯১ সালে প্রকাশিত দুটি প্রবন্ধে এমনটা উল্লেখ করা হলেও, সাম্প্রতিক গবেষকরা এটি নাকচ করে দেন।

রাফায়েল নাদাল

রাফায়েল নাদাল

আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্ট্রে জানাতে ভুলবেন না। সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ... 



জনপ্রিয়