নিউজিল্যান্ডের মসজিদে গুলি, লাশের স্তূপ অল্পের জন্য রক্ষা পেলেন বাংলাদেশি ক্রিকেটাররা নিউজিল্যান্ডের মসজিদে গুলি, লাশের স্তূপ অল্পের জন্য রক্ষা পেলেন বাংলাদেশি ক্রিকেটাররা

নিউজিল্যান্ডের মসজিদে গুলি, লাশের স্তূপ অল্পের জন্য রক্ষা পেলেন বাংলাদেশি ক্রিকেটাররা

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে হ্যাগলি ওভাল মাঠের খুব কাছে একটি মসজিদে আজ শুক্রবার স্থানীয় সময় বেলা দেড়টার দিকে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। শুধু আল নূর মসজিদ নয়, কাছাকাছি লিনউড মসজিদেও হামলা চালানো হয়। প্রথম হামলাটি চালানো হয় মধ্য ক্রাইস্টচার্চের আল নূর মসজিদে। মসজিদ দিয়ে মুসল্লি দিয়ে পরিপূর্ণ ছিল। দ্বিতীয় হামলাটি চালানো হয় কাছাকাছি লিনউড শহরতলির এক মসজিদে।

উদ্বিগ্ন স্বজন, বসে পড়েছেন ফুটপাতেই। ছবি: রয়টার্স

উদ্বিগ্ন স্বজন, বসে পড়েছেন ফুটপাতেই। ছবি: রয়টার্স

হামলায় নারী ও শিশুসহ এ পর্যন্ত ৪০ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে দুজন বাংলাদেশি। গুরুতর আহত ২০ জন। নিহত মানুষের সংখ্যা বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নিউজিল্যান্ডের কোনো মসজিদে কোনো মুসলিমকে না যেতে নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ।

ঘটনাস্থলে পড়ে রয়েছে একটি দেহ। ছবি: রয়টার্স

ঘটনাস্থলে পড়ে রয়েছে একটি দেহ। ছবি: রয়টার্স

হামলার ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে এক নারীসহ চারজনকে আটক করেছে পুলিশ। এ ছাড়া পুলিশ বেশ কয়েকটি আইইডিএস (ইমপ্রুভড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) বিস্ফোরক স্থাপন করা একটি গাড়ি পেয়েছে। বিস্ফোরকগুলো নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে।

ঘটনাস্থলে থাকা একটি গাড়ি। ছবি: রয়টার্স

ঘটনাস্থলে থাকা একটি গাড়ি। ছবি: রয়টার্স

এতে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়েরা। লিটন দাস ও নাঈম হাসান ছাড়া বাংলাদেশ দলের সবাই মাঠে অনুশীলনে ছিলেন।

ছবি - প্রথম আলো

ছবি - প্রথম আলো

বাংলাদেশ দলের বাস তখন মসজিদের সামনে। ক্রিকেটাররা বাস থেকে নেমে মসজিদে ঢুকবেন, এমন সময় রক্তাক্ত শরীরের একজন মহিলা ভেতর থেকে টলোমলো পায়ে বেরিয়ে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যান। ক্রিকেটাররা তখনো বুঝতে পারেননি ঘটনা কী। তাঁরা হয়তো মসজিদে ঢুকেই যেতেন, যদি না বাসের পাশের একটা গাড়ি থেকে এক ভদ্রমহিলা বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের বলতেন, ‘ভেতরে গোলাগুলি হয়েছে। আমার গাড়িতেও গুলি লেগেছে। তোমরা ভেতরে ঢোকো না।’

ক্রিকেটাররা তখন বাসেই অবরুদ্ধ হয়ে আটকা পড়ে থাকেন বেশ কিছুক্ষণ। কারণ পুলিশ ততক্ষণে রাস্তায় গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। বাসে বসেই তাঁরা দেখতে পান, মসজিদের সামনে অনেকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন। অনেকে রক্তাক্ত শরীর নিয়ে বেরিয়ে আসছেন মসজিদ থেকে। যা দেখে আতঙ্কে অস্থির হয়ে পড়েন ক্রিকেটাররা। কারণ বাসে কোনো নিরাপত্তাকর্মী দূরে থাক, স্থানীয় লিয়াজোঁ অফিসারও ছিলেন না।

ছবি - প্রথম আলো

ছবি - প্রথম আলো

বাংলাদেশ দলের মসজিদে ঢোকার কথা ছিল দুপুর দেড়টায়। সংবাদ সম্মেলন শেষ করে যেতে যেতে ১টা ৪০ বেজে যায়। বাংলাদেশ দলের বাস আর পাঁচ মিনিট আগে মসজিদে পৌঁছে গেলে ক্রিকেটাররা সন্ত্রাসী হামলার সময় মসজিদের ভেতরেই থাকতেন। তাহলে কী হতে পারত, আর যা দেখেছেন-দুটি মিলিয়ে মুশফিকুর রহিম হাঁটতে হাঁটতেই অঝোরে কাঁদতে শুরু করেন। তামিম ইকবাল বলতে থাকেন, ‘যা দেখেছি, এরপর আমি আর এক মুহূর্ত এখানে থাকতে চাই না। এই টেস্ট খেলার প্রশ্নই আসে না। আমি দেশে ফিরে যাব।’

 

হামলার ঘটনাটি ফেসবুকে লাইভও করেন অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা ২৮ বছর বয়সী ওই শ্বেতাঙ্গ হামলাকারী। ভিডিওটি অনলাইনে না ছড়াতে নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ। ইতিমধ্যে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি সরিয়ে নেওয়ার কাজ করছে পুলিশ।

উদ্বিগ্ন স্বজনেরা। ছবি: রয়টার্স

উদ্বিগ্ন স্বজনেরা। ছবি: রয়টার্স

বিবিসি, রয়টার্স, এএফপি, নিউইয়র্ক টাইমস, নিউজিল্যান্ড হেরাল্ডসহ স্থানীয় বেশ কয়েকটি নিউজ পোর্টাল থেকে পাওয়া খবরে জানা গেছে, প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, চারপাশে তাঁরা শুধু মানুষের রক্তাক্ত দেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন। এর মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। 

ঘটনাস্থলে রয়েছে পুলিশ। ছবি: রয়টার্স

ঘটনাস্থলে রয়েছে পুলিশ। ছবি: রয়টার্স

একজন প্রত্যক্ষদর্শী ফিলিস্তিনি জানান, তিনি একজনকে মাথায় গুলি করতে দেখেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি পরপর দ্রুত তিনটি গুলির আওয়াজ পাই। ১০ সেকেন্ড পর আবার গুলি শুরু হয়। এটা অবশ্যই স্বয়ংক্রিয় বন্দুক হবে। তা না হলে কোনো মানুষের পক্ষে এত দ্রুত ট্রিগার টানা সম্ভব নয়। লোকজন দৌড়াতে শুরু করে। কারও কারও দেহ রক্তে ভেসে যাচ্ছিল।’ তিনি জানান, ঘটনাস্থল থেকে দৌড়ে পালিয়ে তিনি প্রাণে রক্ষা পান।

আহত একজনকে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। ছবি: রয়টার্স

আহত একজনকে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। ছবি: রয়টার্স

নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা অ্যারডার্ন এ ঘটনার নিন্দা প্রকাশ করে বলেছেন, কত সংখ্যক হতাহত, সে তথ্য এখনো নিশ্চিতভাবে জানতে পারেননি। এখনো তথ্য আসছে। এ ঘটনা নিউজিল্যান্ডের জন্য ঘোর অমানিশা বলে মন্তব্য করেন তিনি। 

স্টাফ ডট কো ডট এনজেড নামের নিউজিল্যান্ডের একটি নিউজ পোর্টালে একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, নামাজ আদায়রত অবস্থায় তিনি গুলির শব্দ শুনতে পান। তিনি দৌড়ে মসজিদ থেকে পালিয়ে এসে দেখে তাঁর স্ত্রী ফুপাতে পড়ে আছেন। মৃত। আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, তিনি শিশুদের গুলিবিদ্ধ হতে দেখেছেন। তিনি বলেন, চারপাশে শুধু লাশ আর লাশ।

ঘটনাস্থলে পড়ে রয়েছে জুতো, রক্তমাখা ব্যান্ডেজ। ছবি: রয়টার্স

ঘটনাস্থলে পড়ে রয়েছে জুতো, রক্তমাখা ব্যান্ডেজ। ছবি: রয়টার্স

রেডিও নিউজিল্যান্ডকে একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, গুলির শব্দ শোনার পর তিনি দেখেন—চারজন মেঝেতে পড়ে আছেন। চারদিক রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। 
পুলিশ জানায়, কোনো বাসিন্দাকে বাড়ি থেকে এবং স্কুল থেকে বের না হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিউজিল্যান্ডের কোথাও মুসলিমদের না যেতে নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ।

 

সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে শহরের হাসপাতাল ও সব স্কুলে যে যেভাবে আছে, সেভাবেই ভেতরে থাকতে নির্দেশে দেওয়া হয়েছে। বাসিন্দাদের বাসা থেকে বের না হতে নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ। ছবি: রয়টার্স

সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে শহরের হাসপাতাল ও সব স্কুলে যে যেভাবে আছে, সেভাবেই ভেতরে থাকতে নির্দেশে দেওয়া হয়েছে। বাসিন্দাদের বাসা থেকে বের না হতে নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ। ছবি: রয়টার্স

আজ মসজিদের কাছাকাছি জলবায়ু বিষয়ক সচেতনতামূলক সমাবেশে শিশুদের অংশ নেওয়ার কথা ছিল। হামলার পর পর ওই সমাবেশ বাতিল করা হয়। ওই শিশুদের বাড়ি ফিরিয়ে নিতে বাবা-মাকে বাড়ি থেকে বের না হতে অনুরোধ জানিয়েছে ক্রাইস্টচার্চ সিটি কাউন্সিল। তারা জানিয়েছে, বাবা-মায়ের জন্য শিশুদের সন্ধান পেতে তারা হেল্পলাইন চালু করেছে। পুলিশ পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত যেন তারা সন্তানদের খোঁজে না বের হন

 

ভিডিওতে এই অস্ট্রেলীয় নাগরিককে হামলা চালাতে দেখা গেছে। ছবি: রয়টার্স

ভিডিওতে এই অস্ট্রেলীয় নাগরিককে হামলা চালাতে দেখা গেছে। ছবি: রয়টার্স

এদিকে ক্রাইস্টচার্চের আল নূর মসজিদে সন্ত্রাসী হামলার পর পর একটি ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে যায়। এতে দেখা গেছে, ভিডিও গেমের মতো একজন বন্দুকধারী স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে গুলি করছে। হামলার ভিডিও দেখে ধারণা করা হচ্ছে, বন্দুকধারী হামলার আগে পুরো ঘটনাটি ভিডিও করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। হয়তো তাঁর মাথায় ভিডিও ক্যামেরা বসানো ছিল 

ভিডিওতে দেখা গেছে, হামলাকারী স্বয়ংক্রিয় বন্দুক নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে মসজিদের দিকে যাচ্ছেন। মসজিদের প্রবেশ কক্ষ থেকেই মুসল্লিদের ওপর নির্বিচারে বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে শুরু করেন। মসজিদের ভেতর ছুটোছুটিরত মুসল্লিদের প্রতি টানা গুলি করতে থাকেন। এরপর মসজিদের এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে ঘুরে ঘুরে গুলি করতে থাকেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে যাঁরা মসজিদের মেঝেতে পড়েছিলেন, তাঁদের দিকে ফিরে ফিরে গুলি করছিলেন তিনি।

এক্সপ্রেস নামের একটি স্থানীয় গণমাধ্যমের অনলাইনে বলা হয়েছে, হামলাকারীকে শনাক্ত করা গেছে। ২৮ বছর বয়সী একজন শ্বেতাঙ্গ। তিনি অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছেন। দুই বছর ধরে তিনি এ হামলার পরিকল্পনা করছেন। হামলাকারী জানিয়েছেন, ইউরোপের দেশগুলোতে বিদেশি হামলাকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে তিনি এ হামলার পরিকল্পনা করেন।



জনপ্রিয়