অচিরেই কি পৃথিবী বাঘশুন্য হয়ে পড়বে? অচিরেই কি পৃথিবী বাঘশুন্য হয়ে পড়বে?

অচিরেই কি পৃথিবী বাঘশুন্য হয়ে পড়বে?

আজ ২৯ জুলাই- বিশ্ব বাঘ দিবস। ২০১০ সাল থেকে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।  বাঘ রয়েছে বিশ্বের এমন ১৩টি দেশ বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, চীন, ভুটান, নেপাল, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম ও রাশিয়ায় প্রতি বছর এ দিনটি পালিত হয়। যদিও বিশ্বে বাঘের সংখ্যার বিচারে ভারত-বাংলাদেশ মিলিয়ে পঞ্চম স্থান দখল করে আছে।

বাঘের নাম শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে উঠে ডোরাকাটা হলুদের বিশাল শক্তিধর এক প্রাণীর ছবি। তার ক্ষিপ্রতা আর শক্তিমত্তা অবিশ্বাস্য। কিন্তু অতি দুঃখের কথা হলো পৃথিবী নামক এই গ্রহ থেকে দিন দিন বাঘের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। হয়তো সেই দিন আর দূরে নেই সেদিন এই পৃথিবীর বুক থেকে বাঘের পদচিহ্ন হারিয়ে যাবে। বলতে দ্বিধা নেই, এর পেছনে পৃথিবীর সেরা প্রাণী মানুষ অর্থাৎ আমরাই বহুলাংশে দায়ী।

source: internet

source: internet

বাঘ (Panthera tigris) বড় বিড়াল জাতের অন্তর্ভুক্ত একটি স্তন্যপায়ী প্রাণী। সিংহ, চিতাবাঘ ও জাগুয়ারের সঙ্গে প্যানথেরা গণের চারটি বিশালাকার সদস্যের মধ্যে এটি একটি। এটি ফেলিডি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত সবচেয়ে বড় প্রাণী। বাঘ ভারত ও বাংলাদেশের জাতীয় পশু। পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক এলাকায় এদের দেখা যায়। 'অ্যানিম্যাল প্ল্যানেট' চ্যানেলের সমীক্ষা অনুযায়ী বাঘ বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রাণী।

বাঘের প্রকারভেদঃ

রয়েল বেঙ্গল টাইগার 

source: internet
এই প্রজাতির বাঘ বাংলাদেশ ও ভারতের সুন্দরবনে দেখা যায়। এ ছাড়াও নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার ও দক্ষিণ তিব্বতের কোনো কোনো অঞ্চলে এই বাঘের দেখা মেলে। বাঘের উপপ্রজাতির মধ্যে বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যাই সর্বাধিক এবং সাইবেরীয় বাঘের পর এই প্রজাতির দ্বিতীয় বৃহত্তম বাঘ। এই বাঘ বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় পশু। বাংলাদেশের ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী এ প্রজাতিটি সংরক্ষিত। বেঙ্গল টাইগারের একটি বর্ণসংকর প্রজাতি হচ্ছে সাদা বাঘ। সাদা বাঘ এখন আর বুনো অবস্থায় নেই। ভারতসহ বিভিন্ন দেশে চিড়িয়াখানায় এ বাঘ দেখা যায়।

মালয় বাঘ

source: internet

source: internet
এই বাঘ মালয় উপদ্বীপ অঞ্চলে পাওয়া যায়। মালয় বাঘ মালয়েশিয়ার জাতীয় পশু। এটিকে ২০০৮ সালে আইইউসিএন মহাবিপন্ন ঘোষণা করেছে।

সাইবেরিয়ান বাঘ 

source: internet

source: internet
রাশিয়ার সাইবেরিয়া অঞ্চলে এই বাঘের দেখা মেলে। এ জন্য এই বাঘের নাম সাইবেরীয় বাঘ বা আমুর বাঘ। বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই বাঘ অন্যান্য বাঘের মতো মহাবিপন্ন। উসুরি এলাকায় দেখা যায় বলে এই বাঘের অন্য নাম উসুরি বাঘ।

ইন্দোচীন বাঘ

source: internet

source: internet
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইন্দোচীন অঞ্চল বিশেষ করে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, চীন ও কম্বোডিয়ায় এই বাঘের দেখা পাওয়া যায়। এই বাঘের বৈজ্ঞানিক নাম বিখ্যাত শিকারি জিম করবেটের নামে নামকরণ করা হয়েছে। এ জাতের বাঘ সাধারণত রয়েল বেঙ্গল টাইগার থেকে ছোট হয় এবং এরা নিরামিষাসী প্রাণী।

সুমাত্রীয় বাঘ

source: internet

source: internet
সুমাত্রার বাঘ একটি দুর্লভ বাঘের উপপ্রজাতি। এর আবাস ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপে। এই বাঘ সবচেয়ে ছোট প্রজাতির বাঘ। এটিকে ২০০৮ সালে আইইউসিএন মহাবিপন্ন হিসেবে ঘোষণা করেছে। 

source: internet


দক্ষিণ চীনা বাঘ

source: internet
চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় ফুজিয়ান, গুয়াংডং, হুনান, জিয়াংসি প্রদেশে পাওয়া যায় এই প্রজাতির বাঘ। এটিকে ১৯৯৬ সালে আইইউসিএন মহাবিপন্ন হিসেবে ঘোষণা করেছে। এটি সম্ভবত বন্য পরিবেশে বিলুপ্ত।

বিলুপ্ত বাঘ 
তিন প্রজাতির বাঘ অতিসম্প্রতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এর একটি বালি বাঘ। এ বাঘ ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপে দেখা যেত এবং ১৯৩৭ সালের পর আর দেখা যায়নি। ইন্দোনেশিয়া থেকেই হারিয়ে গেছে জাভা বাঘ। অন্যদিকে ১৯৫০ সালের দিকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে কাস্পিয়ান বাঘ।

source: internet

২০০০ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত বাঘ সমৃদ্ধি ১৩টি দেশের রাষ্ট্র প্রধানদের সম্মেলনে বাঘ সংরক্ষণকে বেগবান করার জন্য এক ঘোষণা পত্র তৈরি হয়। সেই ঘোষনা পত্রের আলোকে প্রতিবছর ২৯ জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবস পালিত হচ্ছে। অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ২০২২ সালের মধ্যে বিশ্বে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্যমাত্র নির্ধারণ করা হয়। অথচ সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা কমেই চলেছে।

আমাদের রয়েল বেঙ্গল টাইগার সারা বিশ্বের গর্ব। অথচ এই গর্বকে আমরা দিন দিন হারিয়ে ফেলছি। উদ্বেগজনক হারে কমছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের বাঘ। এর পেছনে যেমন রয়েছে প্রাকৃতিক কারণ, রয়েছে মানবসৃষ্ট কারণও। তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে বন বিভাগ ও স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা সুন্দরবনে বাঘ কমে যাওয়ার প্রধান পাঁচটি কারণ চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে-

১. চোরা শিকারিদের বাঘ শিকার

২. খাদ্য সংকট

৩. বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণে লোকালয়ে চলে আসা বাঘ পিটিয়ে হত্যা

৪. বার্ধক্য ও লবণাক্ত পানি পানে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হওয়া

৫. ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে বাঘের মৃত্যু। 

পরিবেশবিদদের মতে ১৯৭৫ সালের পর সুন্দরবনে আর বাঘ বাড়েনি। বন বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত এক দশকে সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগে ২৪টি ও পূর্ব বিভাগে ১২টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরা রেঞ্জের সবচেয়ে বেশী ১৪টি বাঘ গণপিটুনির শিকার হয়ে মারা গেছে। খুলনায় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের হিসেব অনুযায়ী ২০০২ পর্যন্ত বিভিন্ন ভাবে সুন্দরবনে ১২০টি বাঘ হত্যা করা হয়েছে। বনবিভাগের তথ্যানুযায়ী ১৯৮১-২০০৪ পর্যন্ত ৫৩টি বাঘ হত্যার শিকার হয়। ১৯৮১, ৮২, ৮৪, ৮৫, ৮৭ ও ১৯৯৫ সালে কোনো বাঘ মৃত্যুর শিকার হয়নি। ১৯৮৩ সারে ৩টি, ১৯৮৬ সালে ২টি, ১৯৮৮ সালে ১টি, ১৯৯০ সালে ২টি, ১৯৯১ সালে ৪টি, ১৯৯২ সালে ১টি, ১৯৯৩ সালে ৪টি ১৯৯৪ সালে ২টি, ১৯৯৬ সালে ৫টি, ১৯৯৭ সালে ৮টি, ১৯৯৮ সালে ২টি, ৯৯ সালে ৪টি, ২০০০ সালে ৫টি, ২০০১ সালে ১টি, ২০০২ সালে ৩টি, ২০০৪’সালে ৪টি, ২০০৫ সালে ৬টি, ২০০৭ সালে ৪টি, ২০১১ সালে ৪টি ও ২০১২ সালে ১টি বাঘ প্রাণ হারায়।

 

আমাদের রয়েল বেঙ্গল টাইগার শুধু আমাদের নই, সারা পৃথিবীর গর্ব। তাই এঁকে রক্ষার দায়িত্ব আপনার আমার সকলের। তাই আমরা সকলে মিলে যদি জনসচেতনতা গড়ে তুলি তাহলে হয়তো এই বিলুপ্তি রোধ করা সম্ভব হবে। সুন্দরবন আবার প্রকম্পিত হবে হলুদ কালোর গর্জনে।

 

তথ্যসূত্র- বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও জার্নাল



জনপ্রিয়